অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন মাস্টার ছায়েদুল হক

ইব্রাহিম অপু : সন্দ্বীপ

সোমবার , ৬ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
56

আমাদের চারপাশে দুই চোখে যত দূর দেখা যায়, ধ্যানে জ্ঞানে যতটুকু জানা যায় একেক জন মানুষ এক বা একাধিক গুণ বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। কেউ বা দক্ষ প্রশাসক, কেউ বা উদারমনা সমাজ সেবক, কেউ বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর, কেউ বা শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী সৈনিক, কেউ বা অসামপ্রদায়িক হৃদ্যজন, কেউ বা শিল্প সংস্কৃতি অনুরাগী, কেউ বা আদর্শবান দুরদর্শি শিক্ষক। শিক্ষকতা মহান পেশা হলে শিক্ষক হচ্ছেন মহত্তম। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা স্বমহিমায় বিশুদ্ধ জ্ঞান, মানবিক আর নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করে গড়ে তোলেন যোগ্যতম নাগরিক। প্রতিটি শিক্ষিত মানুষের নাগরিক জীবনে শিক্ষকের আদর্শিক প্রভাব নানাভাবে প্রেরণার পথ দেখায়। যদিও বর্তমান সময়ে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায়ও আদর্শের অনুপস্থিতি প্রকট রূপ নিয়েছে, তথাপি কালের আয়নায় এখনো অবারিত আলোকিত মানবতা বোধের পথ দেখায় অনেক মহত্তম শিক্ষকের রেখে যাওয়া আদর্শ আর দেখিয়ে দেয়া পথ। তেমনি একজন শিক্ষক আলহাজ্ব মাস্টার আবু ইউসুফ মোহাম্মদ ছায়েদুল হক (আবু স্যার) । যিনি তার এক জীবনের শিক্ষকতা পেশায় রেখে গেছেন অজস্র মানবীয় দীক্ষার নজির। গ্রামের নামানুসারে মাস্টার ছায়েদুল হক প্রিয় ছাত্র ও অভিভাবকদের কাছে আবু স্যার নামেও সমধিক পরিচিত ছিলেন। হাস্যেজ্জল, সদালাপী, রঙ্গরসময় এবং সরলকোমল মনের অধিকারী ছিলেন তিনি। ছাত্রছাত্রীরা ছিলো তার প্রাণপ্রিয় সন্তানের মতো। বন্ধুর মতো প্রাণখোলা সরলতায় মিশতেন শিক্ষার্থীদের সাথে। আবু স্যার শুধু ছাত্রদের কাছে নয়, অভিভাবকদের কাছে ছিলেন প্রিয় একজন শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের যেকোনো সমস্যা আর বিপদে তিনি ছিলেন পরম আশ্রয়, পরিত্রাতা । কোনো বিষয়কেই জটিলভাবে দেখতেন না। সমাধান খুঁজতেন সহজ পথে। দ্বিধা, অহমিকা, দম্ভ ছিলো না স্যারের মাঝে। ছাত্রশিক্ষকের সমপর্ক কতটা গভীর ও আন্তরিক আস্থাশীল হতে পারে তা কেবল স্যারের ছাত্রছাত্রীরাই অনুভব করতে পারবেন। শিক্ষাসংস্কৃতি ও ক্রীড়ানুরাগী এই মহান শিক্ষকের প্রাণপ্রিয় স্থান ছিলো স্কুল প্রাঙ্গণ।

কিন্তু একজন মানুষের মধ্যে এতসব গুণাবলীর একসাথে সমাবেশ কখনোই পাওয়া যায় না। কিন্তু অবাক হলেও সত্য যে মাস্টার এ ওয়াই এম ছায়েদুল হক প্রকাশ আবু মাস্টারের মধ্যে এ সকল গুণের একত্র সমাবেশ ছিল।

১৯৪৩ সালের ২ রা জুলাই সন্দ্বীপের মগধরা গ্রামের এক ধনাঢ্য পরিবারে আবু স্যারের জন্ম। তাঁর পূর্ণ নাম আবু ইউসুফ মোহাম্মদ ছায়েদুল হক, ডাক নাম আবু। তার পিতার নাম মরহুম তফজল বারী। গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ১৯৫৪ সালে তিনি চট্টগ্রামে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐত্যিবাহী মুসলিম হাই স্কুলে ভর্তি হন। তখনকার দিনে জেলা শহরে এসে পড়াশোনার ভাগ্য অথবা সুযোগ অনেকের ছিল না। ১৯৬০ সালে মাধ্যমিক পাঠ শেষে বৃহত্তর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান স্যার আশুতোষ কলেজ থেকে ১৯৬৪ সালে এইচএসসি এবং ১৯৬৬ সালে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৬৬ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর তিনি সন্দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ পূর্ব সন্দ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুলে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন এবং জরাজীর্ন জুনিয়র হাই স্কুল কে মানোন্নীত করার ব্যাপারে তৎকালীন প্রধান শিক্ষককে সহযোগিতা প্রদান করেন। স্কুল পাঠাগারের জন্যে বই সংগ্রহ করা ও সহকর্মীগণের মাঝে অনুপ্রেরণা সৃষ্টিতে তিনি অদ্বিতীয় ছিলেন। তিনি শিক্ষকতাকে চাকুরী হিসাবে নয় বরং সমাজের সেবার মহান ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে বি.এড ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি প্রাপ্ত হন।কলেজ আঙ্গিনায় তাঁর প্রচেষ্টায় ও অন্যদের সহযোগিতায় একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। বি.এড প্রশিক্ষণ কর্মকালীন সময়ে সেখানে তিনি যথেষ্ট প্রতিভা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন এবং অনেক প্রশাংসাপত্র প্রাপ্ত হন। ১৯৮৮ সালে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক হিসাবে পদোন্নতি লাভ করেন।

তার সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি মৎস্য, সমবায়, স্বাস্থ্য সমাজসেবা বিষয়ে অনেক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করেন এবং সফলকাম হন। অনেকই তাঁকে শিক্ষকতা ছেড়ে স্বাধীন ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগের পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি আর্থিক চিন্তার চেয়ে সমাজ সংস্কার মূলক চিন্তাকে প্রাধান্য দিতেন। সার্বিক দিক থেকে পশ্চাদপদ সন্দ্বীপে আবু মাস্টারের মতো কিংবদন্তীতুল্য একজন গুণী মানুষের জন্ম গ্রহণের বাস্তবিকই বিস্ময়কর। সন্দ্বীপের মতো ছোট জায়গায় এতো বড় মাপের মানুষের জন্ম হয় না। তিনি এত সুপরিচিতি, এত বেশি সুনাম ও সাফল্য অর্জন করেছিলেন যে, বহু মানুষের কাছ তিনি ছিলেন অনুকরণীয়। তার সমাজ সংস্কারের নমুনা পাই, যেমন তৎকালীন সময়ে তিনি ক্লাসের পড়া ক্লাসে আদায় করতেন, টাকার বিনিময়ে জীবনে কাউকে প্রাইভেট পড়াননি। তাঁর শাসন ছিল কড়া। অপরিমেয় সাংগঠনিক প্রজ্ঞা নিয়ে তিনি সমাজ উন্নয়নে এগিয়ে আসেন। একই সাথে অনেক সংগঠনের মূল দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই সর্বপ্রথম সন্দ্বীপে বেসরকারি রেজিঃ প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। যেটি গুপ্তছড়ায় দারুস সালাম প্রাইমারি স্কুল হিসাবে সুপরিচিত। বর্তমানে এটি সরকারি স্কুল। তিনি দারুস সালাম স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন, এনাম নাহার বালিকা বিদ্যালয় ও আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজে ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সন্দ্বীপ শাখার সেক্রেটারি ছিলেন। জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ক্রীড়া সংস্থার সেক্রেটারি ছিলেন।

একদিকে আবু স্যার আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন আধুনিক মানুষ, অন্যদিকে খোদাভীরু ধার্মিক ব্যক্তি। ২০০২ সালে তিনি পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন। নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক আয়োজনে মিলাদুন্নবী (সঃ) উদযাপন করতেন। স্বরস্বতী পুজা উদযাপন করতেন। নাটককের মঞ্চেও দাপটের সাথে অভিনয় করতেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও খেলাধুলায় যথেষ্ট অনুরাগী ছিলেন। খেলার মাঠে তিনি বহুদিন রেফারীর দায়িত্ব পালন করেন। মানুষের অন্ধকার ভুবনে তিনি জ্বালিয়ে দেন আলোর শিখা। শিক্ষক আর আদর্শিক লড়াইয়ের পর্যন্ত করেন সমাজের বিদ্যামান দুষ্ট ক্ষতগুলো। একজন আদর্শ শিক্ষক তাই সমাজের জন্যে বিরাট শক্তি। সন্দ্বীপের সমাজ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আকাশের এমনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আলহাজ্ব এ ওয়াই এম ছায়েদুল হক। ১২ ই মার্চ ২০০৪ খ্রিঃ রোজ শুক্রবার রাত বারোটা পনের মিনিটে চট্টগ্রামে তাঁর নিকট আত্মীয়ের বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এ মৃত্যু অকাল ও আকস্মিক। এ দুঃসংবাদ দেশে এবং বিদেশে হাজার হাজার মানুষকে করেছে মর্মাহত ও শোকাহত। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। কিন্তু তাঁর কর্মসপৃহা, সৃজনশীলতা এবং তারুণ্য দেখলে মনে হতোনা তাঁর এতো বয়স হয়েছিল।

মৃত্যুর সাথে সাথে তার নামে স্মৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । তাঁর মৃত্যুতে এবং প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্থানীয় হাট বাজারগুলোতে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে কালো পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য কটি শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে শোক সভার আয়োজন করেছিল। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধি তার স্মরণে স্মরণসভা, দোয়া মাহফিল, তার নামে মেধাবৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, মেধাবীদেরকে সংবর্ধনা দেয়া হয়, চালু রয়েছে দাতব্য চিকিৎসা কর্মসূচি, রমজান মাসে ছহি সুরা কেরাত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, আর্থিক অনুদান কর্মসুচি ,ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দ্বীপাঞ্চলের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বদের মৃত্যুতে শোকসভা, দোয়া মাহফিল, গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠদান, রমজানের তাৎপর্য শীর্ষক আলোচনা সভা, ইফতার মাহফিল গরীরদের মধ্যে ইফতার সামগ্রী বিতরণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, চল্লিশজন লেখকের লেখা নিয়ে কাজী সামমুল আহসান খোকনের সমপাদনায় ও ‘অবিসংবাদিত’ নামক মরহুমের উপর স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে।

. ওয়াই এম ছায়েদুল হক প্রধান পরিচয় তিনি একজন শিক্ষক। একজন শিক্ষক মানুষের দ্বিতীয় জন্মদাতা। একজন শিক্ষক তাঁর সার্বিক চেতনা থেকে মানুষকে প্রাণীর স্তর থেকে মনুষ্য স্তরে উন্নীত করার অনন্য এবং মহান স্থপতি।

আজ সমাজে বিত্তবানের সংখ্যা, পদের অধিকারী ব্যাক্তির সংখ্যা, পেশী শক্তির বলীয়ানের সংখ্যা আর্শ্চযজনক ভাবে বেড়েছে। কিন্তু বড় মনের অধিকারী ব্যক্তি সংখ্যা, সৎ সাহসের সঙ্গে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার লোকের সংখ্যা, অন্যকে সম্মান দিতে পারা লোকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলাই সংগত। এখন আবু মাস্টারের জীবন ও কর্ম বেশি বেশি চর্চা করা উচিত। তাতে দেশ ও সমাজেরই মঙ্গল। আবু স্যার সমপর্কে জানতে লিখতে আমাকে সহযোগিতা করেছেন মাস্টার ছায়েদুল হক ফাউন্ডেশন এর সাধারণ সমপাদক কাজী শামসুল আহসান খোকন।

x