অনিরাপদ উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানি বন্ধে ওষুধ প্রশাসনকে আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে

শুক্রবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:২৮ পূর্বাহ্ণ
28

অনিরাপদ উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানি করে সে কাঁচামাল ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করার জন্য সাতটি কোম্পানির ওষুধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে ওষুধ প্রশাসন। পত্রিকান্তরে গত ১৭ অক্টোবর এ খবর প্রকাশিত হয়।
খবরে বলা হয়, ওষুধ তৈরির কাঁচামালের বিপজ্জনক উৎস হয়ে উঠেছে চীন। সম্প্রতি চীনের তিনটি বহুল বিক্রিত কাঁচামালে ক্যান্সারের সম্ভাব্য জীবাণু শনাক্ত হওয়ায় অন্তত ২৩টি দেশে অসংখ্য ওষুধ বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। এছাড়া জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধক তৈরির কাঁচামালে নিম্নমানের উপাদান ধরা পড়ায় বাতিল হয়েছে আরেকটি চীনা কোম্পানির সনদ। ঝুঁকিপূর্ণ ও মানহীন কাঁচামাল উৎপাদনকারী এ চারটি চীনা কোম্পানি থেকে অ্যাক্টিভ ফার্মাসিওটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) কিনছে দেশের অনেকগুলো ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, প্রস্তুতকৃত প্রতিষেধকের কাঁচামালে অশুদ্ধতা প্রমাণ হওয়ায় শনাক্ত হয়। এছাড়া নিম্নমানের জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিনের কাঁচামাল তৈরি করায় চীনের আরো একটি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিন বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, নিম্নমানের কাঁচামাল উৎপাদন করায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইউএস-এফডিএ) গত চার বছরে ২০টি কোম্পানিকে সতর্কবার্তা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশের বেশির ভাগ ওষুধ কোম্পানি কাঁচামাল আমদানি করছে। গত ১৪ অক্টোবর ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দুটি অ্যালার্ট নোটিশে দেশের ছয়টি কোম্পানির প্রস্তুতকৃত বেশকিছু প্রচলিত ওষুধ সাতদিনের মধ্যে বাজার থেকে উঠিয়ে নিতে বলা হয়েছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) স্বাক্ষরিত এসব নোটিশে ইনসেপ্টা, স্কয়ার, পপুলারসহ সাতটি কোম্পানির ওষুধ বিশেষ বিশেষ ওষুধ প্রত্যাহারের নির্দেশ রয়েছে।
ভালো মানের কাঁচামালই মানুষের জীবন রক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের কার্যকর উপাদান। স্বাভাবিকভাবেই ওষুধের যথাযথ মান নিশ্চিত করতে হলে নিরাপদ উৎস থেকে এপিআই কেনা অবশ্যই দরকার। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, জার্মানিসহ পশ্চিমা অনেক উন্নত দেশের কোম্পানিগুলোর উন্নত মানের এপিআই উৎপাদন করে থাকে বলে খ্যাতি রয়েছে। বিশ্বে প্রধানত সেগুলোই এপিআইয়ের নিরাপদ উৎস হিসেবে বিবেচিত। একই সাথে কিছু অনিরাপদ উৎসও রয়েছে। এর মধ্যে চীনের কিছু কোম্পানি অন্যতম। বেশ কিছুদিন ধরে চীন ওষুধ তৈরির কাঁচামালের বিপজ্জনক উৎস হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি চীনের তিনটি কোম্পানির বহু বিক্রিত কাঁচামালে ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভাব্য এজেন্ট শনাক্ত হওয়ায় অন্তত ২৩টি দেশে অসংখ্য ওষুধ বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। চীন ছাড়াও আরো কিছু দেশের কোম্পানি ঝুঁকিপূর্ণ ও মানহীন কাঁচামাল উৎপাদন করে। ওষুধের নিম্নমানের কাঁচামাল উৎপাদন করায় ইউএস-এফডিএ গত চার বছরে ২০টি কোম্পানিকে সতর্কবার্তা দিয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আমাদের দেশ, বাংলাদেশের বেশিরভাগ ওষুধ কোম্পানি কাঁচামাল আমদানি করছে। স্বীকার্য সত্য যে, অনিরাপদ উৎস থেকে আমদানি করা এপিআই দিয়ে উৎপাদিত ওষুধের কাঙ্ক্ষিত মান বজায় রাখা একেবারেই অসম্ভব। বস্তুতঃ সেসব জনস্বাস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাণ সংহারক। কাজেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের এসব ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। এরই মধ্যে সুখবর হলো, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ইতোমধ্যে উল্লিখিত তিনটি চীনা কোম্পানি থেকে কেনা এপিআই দিয়ে প্রস্তুতকৃত বেশ কিছু প্রচলিত ওষুধ সাতদিনের মধ্যে বাজার থেকে উঠিয়ে নিতে দেশের সাতটি কোম্পানিকে নির্দেশ দিয়েছে। কোম্পানিগুলোর এখন উচিত, আলোচ্য নির্দেশনার যথাযথ পরিপালন করা। স্বীকার করতেই হবে যে, অ্যালার্ট নোটিশ জারির বিষয়টি একটি সঠিক পদক্ষেপ। তবে,্‌ এখানেই কাজ শেষ নয়। দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে কোন কোম্পানি কোথা থেকে এপিআই আমদানি করছে, কীভাবে ওষুধ তৈরি করছে, ওষুধের কাঙ্ক্ষিত মান বজায় থাকছে কিনা, সেগুলো কঠোরভাবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নিয়মিত বিরতিতে সংস্থাটির তদারকি ও নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
ওষুধ খাতে আমাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য আছে, দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ দেশীয় কোম্পানিগুলো উৎপাদন করছে। আমাদের দেশকে চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ ওষুধ আমদানি করতে হয়। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে স্বল্প পরিসরে কিছু ওষুধ রফতানিও করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি এ দেশীয় ওষুধ কোম্পানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রিকোয়ালিফিকেশনের জন্য আবেদন করেছে। এই সনদ পাওয়া গেলে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সরবরাহকারী হিসেবে বিপুল পরিমাণ ওষুধ রফতানির সুযোগ পাবে। এসব বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় আমাদের দেশের ওষুধ শিল্পের জন্য সামনে বিরাট সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশে ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত অধিকাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। ওষুধ খাত ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে কাঁচামালে এ বিদেশনির্ভরতা কমানো প্রয়োজন। আশার কথা হলো, ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় সরকার এপিআই পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি নির্মিত হলে দেশেই মানসম্পন্ন এপিআই উৎপাদন সম্ভব হবে। যতদিন এপিআই পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হচ্ছে তদদিন নিরাপদ উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। আর সেটি করতে হবে ওষুধ কোম্পানি ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে। আমরা চাই, যথোচিত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ওষুধ খাতের সুশৃঙ্খল বিকাশ ঘটুক।

x