অনাদিস্বাদপূর্ব

ইফতেখার আহমদ সায়মন

মঙ্গলবার , ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
17

শুরুটা হয়েছিল ২০০৭ থেকে। হরেক স্বাদের কর্মশালার অভিজ্ঞতায় নিজেকে ঋদ্ধ করার চেষ্টাটা আমার গত প্রায় এক যুগের। থিয়েটার, ফিল্ম, মূকাভিনয়, মেডিটেশন সহ বেশকিছু কর্মশালার অভিজ্ঞতা থাকলেও গত ২৩-২৬ জানুয়ারি এই চারটি দিন জেলা শিল্পকলা একাডেমির আর্ট গ্যালারি মিলনায়তনে একটি অন্যরকম কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়ে গেলো একজন প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে। ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহের জন্য প্রজেক্ট পেপার মেকিং নিয়ে এই কর্মশালাটি ছিল একদম অন্যরকম একটি কর্মশালা। ঢাকা ডকল্যাবের আয়োজনে এই কর্মশালাটির চট্টগ্রামে সমন্বয়কারী হিসেবে ছিলেন চট্টগ্রামের চলচ্চিত্র সন্ত হিসেবে যাকে ধরা যেতে পারে, সেই রফিকুল আনোয়ার রাসেল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের খন্ডকালীন শিক্ষকতা করার আগ থেকেই গত দুই দশক ধরে চলচ্চিত্র চর্চায় একজন একনিষ্ঠ সাধক হিসেবে নিজের সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার সময়ের থেকে অগ্রসর চিন্তার স্বাক্ষর ছিলো অযান্ত্রিক মিডিয়া স্টাডিজ সেন্টার। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ফিল্ম মেকারস গিল্ডের এরও স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন তিনি। কাজ করেছেন প্রয়াত গুণী নির্মাতা তারেক মাসুদের সাথে। চাঁটগাঁবাসীদের জন্য সংগঠক এর ভূমিকায় তার সাম্প্রতিকতম চলচ্চিত্র চমক হিসেবে ছিলো এই কর্মশালাটি। কর্মশালাটিতে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন ওপার বাংলার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র শিক্ষক ও নির্মাতা নীলোৎপল মজুমদার, প্রখ্যাত ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা সুপ্রিয় সেন, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংগঠক এন.রাশেদ চৌধুরী, চলচ্চিত্র সংগঠক ও নির্মাতা তারেক আহমেদ। চট্টগ্রামের এগারো জন নবীন নির্মাতার এগারোটি প্রজেক্ট পেপার এই কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়। এছাড়াও এই আন্তর্জাতিক কর্মশালায় পর্যবেক্ষক হিসেবে চট্টগ্রামের আরো প্রায় ডজনখানেক বিভিন্ন মাধ্যমের সংষ্কৃতি কর্মীরা অংশ নেন। প্রায় প্রতিদিনই উপস্থিত থেকে উৎসাহ যুগিয়েছেন বিশিষ্ট অনুবাদক ও শিল্পরসিক আলম খোরশেদ, চারুশিল্পী দিলারা বেগম জলি, চারুশিক্ষক ও শিল্পী ঢালী আল মামুন। এছাড়াও একদিনের বিশেষ উপস্থিতি হিসেবে ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ঢাকা ডকল্যাবের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব নাসিরুদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু। সমাপনী দিনে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার জনাব আবদুল মান্নান উপস্থিত ছিলেন প্রধান অতিথি হিসেবে। চারদিনের এই আয়োজনের মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিজের সংস্কৃতি অনুরাগী মানসের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন মাননীয় বিভাগীয় কমিশনার। উপস্থাপিত প্রজেক্ট পেপারগুলোর বিষয় বৈচিত্র্যতা মুগ্ধ করেছে কর্মশালার প্রশিক্ষক ও মেন্টরদের। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপনার জন্য আরো অনেক কাঠখড় যে পুড়াতে হবে, তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে উৎস্যুকজনেরা। তবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে হয় চিন্তার জগতে প্রবল আলোড়ন। কারণ প্রায় প্রতিজনেরই ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। চারদিন আগের ভাবনার জায়গা থেকে চারদিন পরের এই সৃজনশীল যাত্রায় প্রায় প্রত্যেকেরই মধ্যে দেখা গেছে ভাবনার জগতে বেশ ইতিবাচক পরিবর্তন। কর্মশালা চলাকালীন সময়ে প্রদর্শিত সাম্প্রতিক সময়ের ডকুমেন্টারি সিনেমাগুলো বেশ নাড়া দিয়েছে উপস্থিত সবার মনোজগতে। নানান স্বাদের সাম্প্রতিক সময়ের বিশ্ব প্রামাণ্য চলচ্চিত্র দেখার পাশাপাশি, প্রজেক্ট পেপার নিয়ে গ্রুপ ডিসকাশন, মেন্টরদের সাথে ওয়ান টু ওয়ান সিটিং, প্রজেক্ট পিচিং সবমিলিয়ে একটি সমৃদ্ধময় কর্মশালা। উপস্থাপিত বিষয়গুলোর মধ্যে অঙ্কন চাকমার ‘মাউন্টেন ডু নট মুভ’, অতনু পাটোয়ারীর ‘উইলিয়াম ওডারল্যান্ড’, তানিম ইবনে ইউসুফ এর ‘ডেড হোয়াইট মেনস ক্লথ’, সুজন ভট্টাচার্য্য এর ‘আহমেদ হোসেনস ম্যান্ডোলিন’, মোরশেদ হিমাদ্রীর ‘এজেস অফ রকস’, শাহরিয়ার রশিদ মুন্নার ‘জব্বারের বলি খেলা’, জুনায়েদ রশীদের ‘সংস অফ স্টেটলেস’, শামস জামানের ‘টেরিফিক ট্রাফিক’, আবু নাইম মাহতাব মোর্শেদের ‘ড্রিমার’ এবং ইফতেখার আহমদ সায়মনের ‘আ লং পাথ স্টিল টু ওয়াক’ প্রতিটিই ছিলো বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে। তন্মধ্যে পর্যটন উন্নয়ন কর্মসূচীর কারণে উদ্বাস্তু হতে চলা পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর গল্প বলার জন্য ‘আ মাউন্টেন ডু নট মুভ’ এর ছক কেটেছেন অঙ্কন চাকমা। তার এই চেষ্টা স্বীয় জাতিসত্তার পক্ষে তার আন্তরিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ রাখে। একজন দর্শক হিসেবে তার নির্মাণটি দেখার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে অধীর হয়ে অপেক্ষায় আছি। একমাত্র বিদেশী ‘বীর প্রতীক’ খেতাব প্রাপ্ত উইলিয়াম ওডারল্যান্ডকে নিয়ে অতনু পাটোয়ারীর কাজটি করা হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্রে একটি দারুণ সংযোজন হবে বলে মনে হচ্ছে। ‘ডেড হোয়াইট মেনস ক্লথ’ এর বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ। দান পরিণত হয়েছে ব্যবসায়! মানবিক বিপর্যয়ের স্বাক্ষী রোহিঙ্গাদের দিয়ে নানান কাজ হয়েছে, হচ্ছে, হবে। তবে জোনায়েদ রশীদ ও সুজন ভট্টাচার্য্য তাদের নিজ নিজ কাজে রোহিঙ্গাদের দুর্দশার চিত্র না এঁকে ইতিবাচক চিত্র আঁকার চেষ্টা করবেন বলেই মনে হয়েছে। একজন ভালো মানুষ তৈরী করার আকুতি ফুটে উঠবে আবু মাহতাব মোর্শেদের ‘ড্রিমার’ এর কাজটিতে। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের রক মিউজিকের জন্মভূমি বলা চলে। ‘এজেস অব রকস’ এ সেই জন্মভূমির কথা শোনানোর জন্য প্রস্তুতি নিবেন মোর্শেদ হিমাদ্রী। জব্বারের বলি খেলার গল্প শোনাবেন শাহরিয়ার রশীদ মুন্না। নাগরিক জীবনের যানজট বিড়ম্বনাকে তুলে আনবেন শামস সুমন। শুরুর আর্কাইভাল ডকুমেন্টশন এর চিন্তা থেকে বের হয়ে এসে এখন একটা থিয়েটার গ্রুপের ভাঙা গড়ার গল্প এর ফাঁকে চট্টগ্রামের থিয়েটার চর্চার হালচাল তুলে ধরার চেষ্টা করবেন ইফতেখার আহমদ সায়মন তার ‘আ লং পাথ স্টিল টু ওয়াক’ এর মাধ্যমে। এসব কর্মশালার মধ্য দিয়ে পুরানো সম্পর্ক ঝালাই হওয়ার পাশাপাশি নতুন কিছু সম্পর্ক তৈরী হয়। যেমন ‘মুখবই’ এ পরিচিত হওয়া কজন বন্ধুর সাথে এই কর্মশালার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি পরিচয় হলো। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় এই কর্মশালাটি আশ্বাস যোগাচ্ছে এই চর্চা অব্যাহত রাখা গেলে খুব নিকট ভবিষ্যতেই চট্টগ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত কিছু কাজ আমরা দেখতে পাবো। তবে সেজন্য দরকার পড়বে যথাযথ প্রস্তুতি এবং সেসাথে যথোপযুক্ত প্রণোদনা।

Advertisement