অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি রোধ করা যাচ্ছে না

মঙ্গলবার , ১৬ অক্টোবর, ২০১৮ at ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ
49

পাহাড় ধস ও দেয়াল চাপায় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে রোধ করা যাচ্ছে না। গত শনিবার দিবাগত রাতে আকবর শাহ থানাধীন ফিরোজ শাহ কলোনি এবং পাঁচলাইশ থানাধীন হিলভিউ আবাসিক এলাকায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই পাহাড়ে দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে ঝুঁকি নিয়ে অন্তত আরো পাঁচ হাজারের অধিক পরিবার বসবাস করছে। রেলওয়ে মালিকানাধীন এ পাহাড়ে দখলস্বত্বে এসব পরিবার কাঁচা-পাকা ও টিনের বসতঘর গড়ে তুলেছে। সাধারণত দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের লোকজনই ঘরগুলোতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকছেন। এলাকার বাসিন্দারা জানান, রাতে প্রচুর বৃষ্টি হলে একই বসতঘরে তিন দফা পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। রাত ২টার দিকে প্রথমে পাহাড়ের মাটির সামান্য টুকরো নিচে পড়তে শোনা যায়। এরপর আরও দু’বার পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে ঘরটি সম্পূর্ণ মাটির নিচে চাপা পড়ে। ওই ঘরে নিহতরা ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস রাতে এসে উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে সকাল ৭টা নাগাদ লাশ উদ্ধার করে।
বাংলাদেশে পাহাড় ধসের কারণে নানা সময়ে অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হওয়ার সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু কেন এ পাহাড় ধস। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের পাহাড়ি অঞ্চলের উপরের দিকের মাটিতে কঠিন শিলার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ফলে আমাদের পাহাড় ধসের আশঙ্কা এমনিতেই বেশি। তাছাড়া মানুষ এসব জায়গায় বসবাসের জন্য ও চাষাবাদের জন্য পাহাড়ের উপরের দিকের শক্ত মাটির স্তরও কেটে ফেলে। পাশাপাশি বড় গাছপালা কেটে ফেলায় ভারি বৃষ্টিপাত হলেই পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বনভূমি উজাড়, অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, পরিকল্পিত বনায়ন না করা, রাস্তা করার ক্ষেত্রে আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ ও বিজ্ঞান সম্মত ড্রেন বা নিষ্কাশন ব্যবস্থা না রাখা, যত্রতত্র পাহাড় কেটে বাসস্থান নির্মাণ, আবহাওয়া বা জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার দেখা দিচ্ছে। এছাড়া অতি বৃষ্টি ও ভূমি ক্ষয়ের কারণে পলি জমে প্রাকৃতিক নিয়মে সৃষ্ট ছড়া, নালা, খাল-নদী ভরাট হওয়ার প্রেক্ষিতে পানি নিষ্কাশন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা না থাকা, বেলে প্রকৃতির পাহাড়ে বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকায় দীর্ঘ সময় একটানা অতি বৃষ্টির ফলে পানি ভিতরে প্রবেশ করার কারণে ন্যাড়া পাহাড়ের স্থিতিস্থাপকতা-স্থিতিশীলতা যেমন একদিকে বিনষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে সহজেই পাহাড়গুলো ভঙ্গুর হচ্ছে।
বাংলাদেশের পাহাড়গুলোতে কোন কঠিন শিলা নেই। তাই বৃষ্টির কারণে এ ধরনের মাটি পানি শুষে ফুলতে থাকে। তাছাড়া কঠিন শিলা না থাকায় মাটিগুলো নরম ও পিচ্ছিল হয়ে যায়। ফলে ভারি বর্ষণের সাথে সাথে মাটি ভেঙে পড়ে। তাছাড়া যাঁরা পাহাড়ে থাকেন তাঁরা ঘর নির্মাণের জন্য পাহাড়ের সবচেয়ে শক্ত মাটির স্তরও কেটে ফেলেন। এতে পাহাড় ধসের শঙ্কা আরও তীব্র হয়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে পাহাড় ধসে প্রাণহানিকে আর্থ-সামাজিক, পরিবেশগত এবং রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন একজন বিশেষজ্ঞ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল এবং পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম পাহাড় ধসের কারণ নির্ণয় বিষয়ক সমপ্রতি গঠিত কারিগরি কমিটির একজন সদস্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই এর সমাধান করতে হবে। এক সাক্ষাতকারে তিনি পাহাড় ধসের কারণ হিসেবে তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়গুলো বালুময় পাহাড় এবং এসব পাহাড়ের ভেতরে অনেক ফাটল থাকায় অতিবৃষ্টির ফলে প্রাকৃতিকভাবেই ‘পাহাড়ের ফাটলে পানি ঢুকে ধস হতে পারে’।
দ্বিতীয় কারণটি মানবসৃষ্ট, অবৈধভাবে প্রচুর পরিমাণ পাহাড় কাটার ফলে পাহাড় ধস হচ্ছে এবং পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী অনেকে মারা যাচ্ছেন। এ পাহাড় ধসের জন্য মানবসৃষ্ট কারণকেই দায়ী করছেন পরিবেশবিদরা। বারবার অভিযানের পরও ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে বসবাসের আগ্রহ দূর করতে হবে। মৃত্যুর মর্মান্তিক চিত্রকে তাদের সামনে উপস্থাপনার মাধ্যমে পাহাড় বসবাসে নিরুৎসাহিত করা জরুরি। যারা পাহাড় কাটায় জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এরা যতই প্রভাবশালী হোক, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারলে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে রোধ করা সম্ভব হবে না।

x