অনন্য থিয়েটারের চিঠি

অনুপ মিত্র

বৃহস্পতিবার , ২৩ মে, ২০১৯ at ৪:০৬ পূর্বাহ্ণ
18

গত ৩ জানুয়ারি ২০১৯ ছিলো সাহিত্যিক নাট্যকার চৌধুরী জহুরুল হকের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী। এত বছর পর চট্টগ্রামের “নাট্য মঞ্চ” এই দিনটি স্মরণ সন্ধ্যার আয়োজন করাতে তাদের সাধুবাদ জানাতে হয়। এটা আমাদের দায়বদ্ধতার পরিচয় বলে আমি মনে করি। প্রতি বছর এই দিনটি “নাট্য মঞ্চের” মাধ্যমে পালন করার আশা রাখি। “নাট্য মঞ্চের” সম্পাদক জাহেদুল আলম এই আশা ব্যক্ত করেছেন।
স্মরণ সন্ধ্যার তৃতীয় পর্বে ছিল নাটক “চিঠি”, রচনা- চৌধুরী জহুরুল হক, সম্পাদনা ও নির্দেশনা- সুচরিত চৌধুরী, পরিবেশনায়- অনন্যা থিয়েটার। এর মধ্যে “নাট্য মঞ্চ” আবারও চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামে ৮, ৯, ১০ এপ্রিল নাট্য উৎসবের আয়োজন করেছে।
গত ৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় মঞ্চায়িত হয় নাটক “চিঠি”। এটা একটা নিছক হাসির নাটক মাত্র।
ছোট বেলায় গ্রাম-গঞ্জে দেখেছি কিছু লোকজন ছিল যারা প্রতিদিন সকালে গ্রামের কোন হাটে বা বাজারে টুল পেতে বসতেন। যাদের আত্মীয়-স্বজন, ছেলে-মেয়ে, স্বামী দেশের বাইরে থাকতেন তারা লিখতে পারতেন না বা বলে পয়সার বিনিময়ে চিঠি লেখাতেন। যারা লিখে দিতেন তারা এই রোজগারের উপর ভিত্তি করে সংসার চালাতেন। এই নাটকটি দেখতে গিয়ে আমার সেই আগের দিনের কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু এই নাটকের প্রেক্ষাপট কিছুটা আগের মত মনে হলেও আসলে ব্যাপারটা নেহাতই হাসির। ছেলে নুরুল লেখাপড়া করে ভালো চাকরি করে, ভালো বেতন পায়। লেখাপড়া জানে অথচ মাকে চিঠি লিখতে পারে না। লিখতে গেলে তার সবকিছু গুলিয়ে যায়। তাই সে স্মরণাপন্ন হয় তার সিনিয়র রুমমেট শাবু ভাই এর। শাবু ভাই চিঠি লেখার জন্য নিয়ে যায় পত্র লিখক পাঠোয়ারীর কাছে। সৌভাগ্যক্রমে পাটোয়ারী বাড়ি না থাকাতে পাটোয়ারীর মেয়ে জেবুনের সাথে দেখা হয়ে যায়। নুরুলকে জেবুন চিঠি লিখে দেয়। এভাবে নাটক চলতে থাকে।
অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সাধারনত সবাই সমান তালে অভিনয় করতে পারেন না। যদিও ভালো নাটক পরিবেশন করতে হলে তাই করা উচিত। সৎভাবে, আত্মবিশ্বাসের সাথে অভিনয় করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। সেটা সেট হোক বা লাইট অথবা মিউজিক।
এখানে একটা কথা না বললেই নয়, দর্শককে হাসির নাটক উপহার দেওয়া এবং দর্শক হাসানো খুব কঠিন ব্যাপার। সংলাপ প্রধান নাটক, ঘটনা প্রধান নাটকে দর্শক ধরে রাখা বা দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করানো যতই সহজ; ছোট-খাট সংলাপ বা অভিব্যক্তি ব্যক্ত দর্শক হাসানো বড় কঠিন বলে আমি মনে করি। ভালো অভিনেতা না হলে এধরনের হাসির নাটক কম সময় মহড়া করে বা দুই-একবার মঞ্চস্থ করলে নাটক কোনভাবেই মঞ্চ সফল হবে না। নির্দেশক জানালেন, এই নাটকটির মহড়া খুব বেশি সময় নিয়ে করতে পারেননি বলে কলা-কুশলীরা অভিনয় রপ্ত করতে সময় কম পেয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, আমরা চট্টগ্রামে যারা নাটকের সাথে জড়িত এবং নাটকের দর্শক, সবাই একজন অভিনেতাকে খুব ভালো ভাবেই চিনি এবং জানি। তিনি হচ্ছেন শুশোভন চৌধুরী। এই নাটকে তিনি পাটোয়ারীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। আমরা সবাই জানি ১৯৭৮-৭৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিশুদের “নতুনকুঁড়ি” নামে একটা অনুষ্ঠান হতো, সেই অনুষ্ঠানে শুশোভন চৌধুরী ১৯৭৮ সালে বিটিভিতে চট্টগ্রাম থেকে একক অভিনয়ে ১ম স্থান দখল করে চট্টগ্রামের তাঁর গৌরব ছিনিয়ে এনেছিলেন। এ কারণেই বলছিলাম, এই তুখোড় অভিনেতার সাথে তাল মিলিয়ে অভিনয় করা একটু কঠিনতো বটেই। যাই হোক সবাই চেষ্টা করেছে ভালো করার।
নুরুলের চরিত্রে তিলক চক্রবর্তী অভিনয়ে সাবলীল ছিলেন। শ্বাস-প্রশ্বাসে জন্য নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সংলাপের টেইল ড্রপ পরিলক্ষিত হয়েছে বার বার। শাহাবুদ্দিন চরিত্রে দিলীপ রুদ্র অভিনয়ে জড়তা কাটাতে পারেননি। সংলাপ ভুলে গিয়ে পুনরায় সংশোধন করতে চেয়েছেন, যা দর্শকদের চোখ এড়ানো সম্ভব হয়নি। মুকাভিনয় আশানুরূপ হয়নি। আলমগীর চরিত্রে নির্দেশক সুচরিত চৌধুরী হঠাৎ করে মঞ্চে এসে আলো জ্বালিয়ে দিলেও মঞ্চ ত্যাগের পর নাটক নিষ্প্রভ হয়ে যায়। জেবুন চরিত্রে ডলি দাশ ভালেই করেছেন। এর বাইরে তার আর কিছুই করার ছিল না। আমার মনে হয় ডলি সব চরিত্রই সাবলীল ভাবে অভিনয় করার চেষ্টা করেন। তিনি সৎ এবং আত্মবিশ্বাসী অভিনেত্রী।
আবহ সংগীতে ছিলেন দেবাশীষ রায়, আলোকে দেবব্রত বণিক, শব্দ নিয়ন্ত্রণে প্রকৃত রঞ্জন দাশ ও বিজন মজুমদার, মঞ্চ পরিচালনায় মিঠু দাশ ও জিয়াউর রহমান শৈশব। সবদিক বিবেচনায় নাটকটি মঞ্চ সফল। আমরা নির্দেশকের কাছ থেকে আগামীতে আরও ভালো নাটক আশা করি।

x