অধ্যাপক মাহবুবুল হক সারস্বত চর্চায় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার

দিলীপ কুমার বড়ুয়া

শুক্রবার , ২ নভেম্বর, ২০১৮ at ৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ
31

ড. মাহবুবুল হক বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য অঙ্গনে এক বিশিষ্ট নাম। তাঁর পরিচিতি বিভিন্ন পরিসরে পরিব্যাপ্ত। লেখালেখি, সম্পাদনা, শিক্ষকতা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর
কৃতিত্ব ও প্রয়াস তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলা বানানে এক বিশেষজ্ঞ হিসেবে, মননশীল প্রাবন্ধিক ও পরিশ্রমী গবেষক হিসেবে তিনি সুধীজনের কাছ থেকে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছেন। আগামীকাল তাঁর ৭০তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে ঐদিন বিকেল চারটায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এক সংলাপ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া আগামী ১৭ই নভেম্বর শনিবার বিকেল সাড়ে চারটায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে সর্বস্তরের
সংস্কৃতিকর্মীদের উদ্যোগে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছে। খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অতিথি থাকবেন বরেণ্য সাহিত্যিক ড. পবিত্র সরকার।
অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ভাষাবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক একজন নিভৃতচারী কর্মযোগী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। যিনি একাধারে গবেষক, প্রাবন্ধিক, বিতর্ক সংগঠক, কলাম লেখক আর সঠিক ব্যাকরণ জানা ও বাংলা ভাষার প্রায়োগিক জ্ঞানসমপন্ন গুণান্বিত একজন প্রখর ব্যক্তিত্ব। প্রতিভার প্রাচুর্যে দীর্ঘদিন বাংলা ভাষা, বানান রীতি-নীতি, বাংলা ব্যাকরণ ও প্রাথমিক ও উচ্চ শিক্ষা নিয়ে কাজ করা একজন কীর্তিমান। শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রায়োগিক বাংলা ও ফোকলোর চর্চা, গবেষণা, সমপাদনা, অনুবাদ ও পাঠ্যবই রচনা করে সমাদৃত সকলের কাছে। প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে তাঁর। ফরিদপুর জেলার মধুখালিতে ১৯৪৮ সালের ৩ নভেম্বর মাহবুবুল হক স্যারের জন্ম। তবে শৈশব থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন চট্টগ্রামে । শৈশব, কৈশোর বয়স থেকে যে পরিবেশ, যে সংস্কৃতি, যে সংগ্রামশীলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন, সব সময় তাঁর নিত্যাকার যাপিত জীবনে একটা মানবিকবোধ কাজ করেছে। ৬২-র শিক্ষা আন্দোলনে যোগ দেয়ার পর তরুণ বয়সে তিনি এদেশের প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। চট্টগ্রাম জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হিসেবে তিনি উনসত্তরের গণ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। অধ্যাপক মাহবুবুল হক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ্লাতক (সম্মান) এবং ১৯৭০ সালে একই বিষয়ে ্লাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জীবনের পথ চলতে তাঁর প্রতিটি মুহূর্ত তিনি ব্যয় করেছেন শিক্ষার প্রসারতার কাজে । নিজেকে গড়ে তুলেছেন আন্তরিক নিষ্ঠায়, সচেতনতায়, প্রজ্ঞায়, সমাজের জন্য, দেশের জন্য, জ্ঞান বিতরণের জন্য। চেতনায় ঋদ্ধ এ ভাষাজ্ঞানী মেধা ও কর্মনিপুণতায় গড়েছেন আপন ভূবন । ১৯৭১-এ অংশগ্রহণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর চাকরি না নিয়ে দেশ গড়ার সংগ্রামে তৎপর হন। দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছেন চট্টগ্রামের রাংগুনীয়া কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। কিছুকাল তিনি পালন করেছেন কুমিল্লার সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের চলতি দায়িত্ব।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সৃজনশীলতায় প্রায়োগিক বাংলা ও ফোকলোর চর্চা, প্রবন্ধ, গবেষণা, অনুবাদ, সমপাদনা ও পাঠ্য বই রচনা করে তিনি দেশে-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁর চল্লিশটিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশ, ভারত ও পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। তিনি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেশ কয়েকটি বাংলা পাঠ্য বইয়েরও রচয়িতা। নতুন শিক্ষানীতি অনুযায়ী ২০১২ ও ২০১৩ শিক্ষাবর্ষের বাংলা শিক্ষাক্রম ও বাংলা পাঠ্যবই প্রণয়নে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন আহ্বায়ক হিসেবে। সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থায় নেমে এসেছে নানান বৈরীতা। বাংলা ভাষা আজ অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। মাতৃভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করে ভাষার প্রতি মমত্ববোধ সৃষ্টি না হলে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। নিরলস সাধক এর ন্যায় জ্ঞানের অন্বেষণে নিজের ভাবনাচিন্তাকে বিদ্যাচর্চায় প্রবাহিত করেছেন। ভাষা ঋদ্ধ করেছে তাঁর জীবনবোধ। ভাষার নানাদিকের সারস্বত চর্চায় তাঁর নিবিষ্টতা একাগ্রতা, আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত হতে পারে। গবেষণা, গ্রন্থ প্রণয়ন, সমপাদনা, অনুবাদের কাজ, বক্তৃতার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের এক পরম ভরসার মানুষ হয়ে উঠেছেন। ড. মাহবুবুল হক বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডসহ নানা স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন বিশেষজ্ঞ হিসেবে।
অধ্যাপক মাহবুবুল হক তাঁর যাপিত জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সমীকরণে কখনো গাণিতিক হিসেব করেননি। সংগ্রামশীল জীবনবোধে নিজেকে গড়েছেন। যে বোধে মানুষকে ভালোবাসার, দেশকে ভালোবাসার, বিশ্বকে ভালোবাসার অবিশ্রান্ত আয়োজন। তাঁর জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা সাধনা এবং গবেষণার বিস্তৃত ক্ষেত্রে রয়েছে শিল্প, সাহিত্য, ভাষার চর্চা । বাংলা বানানের নিয়মের বই একসঙ্গে ঢাকা এবং কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা একাডেমির বানান অভিধান ও প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম প্রণয়নে মাহবুবুল হক স্যারের অবদান অনস্বীকার্য । বাংলা একাডেমি প্রকাশিত প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ গ্রন্থের সহযোগী সমপাদক ও লেখক হিসেবে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের তিনি অন্যতম সমপাদক। বানানের নিয়ম এর আগে কেউ লিখেননি , ফলে এটি আলোড়ন তৈরি করেছিল মানুষের মননে। প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম প্রণয়নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। পেয়েছেন নজরুল-গবেষণার জন্য নজরুল পদক, লেখালেখি ও গবেষণার জন্য ফিলিপস পুরস্কার, মুক্তিযুদ্ধ পদক, মধুসূদন পদক, চট্টগ্রাম একাডেমি পুরস্কার, অবসর সাহিত্য পুরস্কার, রশীদ আল ফারুকী সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তি তাঁর বাংলা সাহিত্য ও গবেষণা কর্মের এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি। ড. মাহবুবুল হক কলকাতা, যাদবপুর, বিশ্বভারতী, কল্যাণী, পাতিয়ালা, গৌড়বঙ্গ ও আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, ত্রিপুরায় ও কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে ভাষা-সাহিত্য, ইতিহাস ও ফোকলোর বিষয়ে সম্মেলন ও সেমিনারে গবেষণা-প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। সার্ক ফোকলোর উৎসবে তিনি বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছেন । তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : বাংলা বানানের নিয়ম রবীন্দ্র সাহিত্য রবীন্দ্র ভাবনা, তিনজন আধুনিক কবি , ইতিহাস ও সাহিত্য সংস্কৃতি ও লোকসংস্কৃতি বইয়ের জগৎ : দৃষ্টিপাত ও অলোকপাত , বাংলা কবিতা : রঙে ও রেখায়, ভাষার লড়াই থেকে মুক্তিযুদ্ধ , মুক্তিযুদ্ধ, ফোকলোর ও অন্যান্য, বাংলার লোকসাহিত্য : সমাজ ও সংস্কৃতি বাংলা ভাষা : কয়েকটি প্রসঙ্গ , রবীন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, বাংলা সাহিত্যের দিক-বিদিক , কৃতীজন কৃতিকথা, মাঙ্মি গোর্কির মা, প্রবন্ধ সংগ্রহ ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি রচনা ও সমপাদনা করেছেন বহু শিশুতোষ গ্রন্থ । তিনি তাঁর জ্ঞান এর উৎকর্ষতায় উদারতা আর বিনয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নিজের স্বকীয় সত্তাকে করেছেন ব্যতিক্রমী।
মাহবুবুল হক স্যারকে দেখেছি কলেজ জীবনে। তাঁর সদাহাস্য মুখাবয়ব শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে দিত। তিনি ছিলেন ছাত্রদের চোখে একজন প্রজ্ঞাবান মাস্টারমশাই । তাঁর সাথে সখ্যতা হতে দেরি হয়নি। অনেক বছর স্যারের আলোয় ফেরা হয়নি।স্যারের কথাকলিতে যাতায়াত ছিলো। স্যারকে দেখতাম বামপন্থী রাজনীতির অভিজ্ঞতায়। তিনি ছিলেন সামাজিক দায়বদ্ধতায় প্রোজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন পরিপূর্ণ মানুষ। সারস্বত চর্চায় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারের চেতনা তাঁর মধ্যে দেদীপ্যমান। তিনি আমাদের শিল্প-সাহিত্যের শোভিত উদ্যানে অনন্তকাল আলো ছড়াবেন তাঁর নিজস্ব আলোর রশ্মিতে এ প্রত্যাশা সবার।

x