অধিকাংশ ইয়ার্ডে কার্যকর নেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশ অধিদপ্তরকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে

জাহাজ ভাঙা শিল্প

সোমবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ
46

জাহাজ ভাঙা শিল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে শিপ ইয়ার্ডগুলোয় রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর রাখার নির্দেশনা রয়েছে সরকারের। কিন্তু এই নির্দেশনা মানছেন না ইয়ার্ড মালিকেরা। বিদেশ থেকে আনা পুরনো জাহাজের রাসায়নিক বর্জ্য অপরিশোধের অবস্থায় সাগরে ফেলছে অধিকাংশ শিপ ইয়ার্ড। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে সামুদ্রিক পরিবেশ ও প্রাণ বৈচিত্র্য। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অকার্যকর রেখে পরিবেশ দূষণের অভিযোগে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি শিপ ইয়ার্ডকে জরিমানা করা হয়। এছাড়া চট্টগ্রামে পারকি সমুদ্র সৈকতে অনুমতিবিহীনভাবে আটকে পড়া জাহাজ কাটার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে দুই কোটি টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত এ খবরে আরো বলা হয়, চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, আমদানি করা পুরনো জাহাজ কাটার সময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নানা পরিকল্পনা নেওয়ার কথা থাকলেও স্রেফ খরচ কমানোর জন্য সেগুলো ব্যবহার করছে না শিপ ইয়ার্ডগুলো। এতে করে পুরনো জাহাজ কাটার ফলে সমুদ্রে মিলছে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বলেন যে, সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি শিপ ইয়ার্ডে অভিযান চালানো হয়েছে। এ সময় দেখা গেছে বেশির ভাগ শিপ ইয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, একেবারে বন্ধ রাখা হয়েছে। ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার ফলে বিষাক্ত বর্জ্য কিংবা বর্জ্য থেকে নিঃসরণ করা তেল সরাসরি সমুদ্রে ফেলা হচ্ছে এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে। শিপ ইয়ার্ডগুলোকে জরিমানাসহ কেন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মানা হচ্ছে না, সে বিষয়ে শোকজ করা হয়েছে।
দেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বর্তমানে দেশে ইস্পাতের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ যোগান আসে জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে। এ শিল্প নানাভাবে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে এ শিল্পকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু উপশিল্পও গড়ে উঠেছে। এসব ইতিবাচক দিক থাকলেও কিন্তু নেতিবাচক দিকও কম নেই। সংলগ্ন এলাকাগুলোর ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের জন্যে জাহাজ ভাঙা শিল্প অনেকাংশে দায়ী। এ শিল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে শিপ ইয়ার্ডগুলোয় রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর রাখার সরকারি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অনেক ইয়ার্ড মালিক এ নির্দেশনা যথাযথভাবে মানছেন না। বিদেশ থেকে আনা পুরনো জাহাজের রাসায়নিক বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় সাগরে ফেলছে অধিকাংশ শিপ ইয়ার্ড। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে সামুদ্রিক পরিবেশ ও প্রাণ বৈচিত্র্য। শিপ ইয়ার্ডগুলো এভাবে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করার অবস্থা অব্যাহত থাকলে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশ যে পুরোপুরি ধ্বংস হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এটা কোনভাবেই চলতে দেওয়া যায় না। চট্টগ্রামের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থেই শিপ ইয়ার্ডগুলোয় দ্রুত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এটা করতে হলে ইয়ার্ড মালিকদের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরেরও নজরদারি আরো বাড়াতে হবে। দেখা গেছে, শিপ ইয়ার্ডে যেসব জাহাজ কাটা হয়, তার বেশির ভাগই অয়েল ট্যাংকার বা তেলবাহী জাহাজ। স্বভাবতই এসব জাহাজে থাকে কালো তেল ও বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য। কাজেই উল্লেখিত বিষাক্ত পদার্থ যাতে সমুদ্রে মিশতে না পারে, তার জন্য রয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা। নিয়ম অনুযায়ী শিপ ইয়ার্ডগুলোয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে অয়েল ওয়াটার সেপারেশন প্লান্ট, ইনসিনারেটরসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে না। স্রেফ খরচ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও শিপ ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ সেগুলো ব্যবহার করছে না বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন এটা পরিতাপের বিষয় এবং মোটেই কাম্য নয়। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যতিক্রম দেশের পরিবেশগত নাজুকতা যে বাড়িয়ে তুলবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কাজেই এ ধরনের প্রবণতা শক্ত হাতে অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে। সুখের বিষয়, পরিবেশ অধিদপ্তর এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি শিপ ইয়ার্ডে অভিযান চালিয়েছে। অভিযান চলাকালে অধিকাংশ শিপ ইয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একেবারে বন্ধ রাখার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অকার্যকর রেখে পরিবেশ দূষণের অভিযোগে এরই মধ্যে কয়েকটি শিপ ইয়ার্ডকে জরিমানাও করা হয়েছে। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে শুধু আর্থিক জরিমানা করলে সেটা হবে গুরু পাপে লঘুদণ্ড। দরকার হলো, নির্দেশনা অমান্যকারীদের আরো কঠোর শাস্তি। সেক্ষেত্রে আইন অমান্যকারী শিপ ইয়ার্ডের নিবন্ধন বাতিল করার কথা ভাবা যেতে পারে। এটা হলে শিপ ইয়ার্ড মালিকেরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে নিজেদের ভেতর থেকে চাপ অনুভব করবেন। প্রায়ই দেখা যায়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আকস্মিকভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান চলে। কয়েকদিন চলার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। অভিযান বন্ধ হলে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর অপকর্ম আবার শুরু হয়। কাজেই বিষয়টি মাথায় রেখে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালিয়ে যেতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর এখন যে অভিযান পরিচালনা করছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। সংস্থাটির নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনাই পারে পরিবেশ অক্ষুন্ন রেখে জাহাজ ভাঙা শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করতে। আমরা আশা করি, বিষয়টি মাথায় রেখে পরিবেশ অধিদপ্তর আরো সক্রিয় হবে।

x