অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৪ পাহাড়ে আজ থেকে সাঁড়াশি অভিযান

সবুর শুভ

বুধবার , ৩ জুলাই, ২০১৯ at ৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ
143

‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ পাহাড় অবৈধ বসতিমুক্ত করতে এবার সাঁড়াশি অভিযান শুরু হচ্ছে। ১৪ পাহাড়ে অভিযানের ছক করা হয়েছে মাত্র ৭ দিনের মধ্যে। একযোগে অভিযান চালাবেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের ৬ চৌকস নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁরা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে নগরীর বিভিন্ন সার্কেলে কর্মরত রয়েছেন। আজ বুধবার সকাল থেকে শুরু হচ্ছে এ অভিযান।
এদিকে, ১৪ পাহাড়ের মধ্যে আলোচিত মতিঝর্ণা ও বাটালি পাহাড় বাদ পড়েছে। এখানে আরো অবৈধ স্থাপনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযান শুরুর বিষয়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা সাব-কমিটির সভাপতি পরিবেশ অধিদপ্তরের (মহানগর) পরিচালক মোহাম্মদ আজাদুর রহমান মল্লিক বলেন, অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধ বসতি উচ্ছেদে আমরা আবারো অভিযান শুরু করছি। আগামীকাল (আজ) থেকে অভিযান শুরু হচ্ছে।
অভিযানের তালিকায় থাকা ১৪ পাহাড়ের মধ্যে রয়েছে বায়তুল আমান সোসাইটি এলাকাস্থ হারুন খানের পাহাড়, আকবরশাহ আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, পরিবেশ অধিদপ্তর সংলগ্ন সিটি কর্পোরেশনের পাহাড়, এম আর সিদ্দিকীর পাহাড়, মধুশাহ পাহাড়, পলিটেকনিক কলেজ সংলগ্ন পাহাড়, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, আমিন কলোনি সংলগ্ন ট্যাংকির পাহাড়, মিয়ার পাহাড়, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পাহাড়, কৈবল্যধামস্থ বিশ্ব কলোনি পাহাড়, লেকসিটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, ফয়’স লেক আবাসিক এলাকার পাহাড় ও পূর্ব ফিরোজশাহ ১ নং ঝিল সংলগ্ন পাহাড়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন জানান, আগামী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের।
তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানার ১৭ ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ পাহাড়কে অবৈধ বসতিমুক্ত করার জন্য জেলা প্রশাসনের তরফে এর আগে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়। ৭টি সরকারি সংস্থার ও ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ে থাকা অবৈধ বসতি গত ১৫ মের মধ্যে উচ্ছেদ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল জেলা প্রশাসন। এর আগে ২৫ এপ্রিল সরকারি ও বেসরকারি সকল পক্ষকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল।
এদিকে, পাহাড়ে অবৈধ বসতি গুঁড়িয়ে দিতে গত ৫ মে বাটালি হিলে ও ১৩ মে শেরশাহ বাংলাবাজার এলাকায় বড় ধরনের অভিযান চালায় জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটগণ। অভিযানগুলোতে বাধাও দিয়েছিলেন রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। উল্টো রাস্তা অবরোধ করে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে এক কাতারে দেখা গিয়েছিল।
চট্টগ্রাম জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস, পাহাড় কর্তন ও করণীয় সম্পর্কে রূপরেখা সম্বলিত ৫ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদন গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জমা দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান চৌধুরী। ওই প্রতিবেদন থাকা তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে লোকজন অবৈধভাবে বসবাস করলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব পরিবারে আছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগসহ বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সুবিধা। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যগুলো সঠিক প্রমাণিত হচ্ছে বারবার।
এদিকে, বর্ষায় পাহাড় ধসে প্রাণহানির বিষয়টি মাথায় রেখে অবৈধ বসতি উচ্ছেদে পাহাড় ব্যবস্থাপনা সাব-কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক (মহানগর) মোহাম্মদ আজাদুর রহমান মল্লিক। গত ২৪ জুন তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাব-কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ থেকে চলবে উচ্ছেদ অভিযান।
জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি ২৮ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৭ পাহাড়ে বসবাস করছে ৮৩৫ পরিবার। এর মধ্যে ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০ পাহাড়ে অবৈধভাবে বাস করছে ৫৩১ পরিবার। তাছাড়া সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন ৭ পাহাড়ে বাস করছে ৩০৪ পরিবার।
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করতে গত ৩ মার্চ জেলা প্রশাসন থেকে চিঠি যায় সদর, কাট্টলী, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ ও পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে। পরে ছয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের নাম ও মালিকানা, অবৈধ বসবাসকারীর নাম, পরিবারের সদস্য সংখ্যা উল্লেখ করে হালনাগাদ তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেন। ওই তালিকায় অবৈধ স্থাপনার বিবরণ এবং অবৈধভাবে ভাড়া প্রদানকারীর নাম-ঠিকানা রয়েছে। উল্লেখিত পাহাড়গুলোর কয়েকটিতে ইতোমধ্যে কয়েক দফায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী, রেলওয়ের লেকসিটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ২২ পরিবার, পূর্ব ফিরোজ শাহ ১ নং ঝিল সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ২৮ পরিবার এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মালিনাকানাধীন কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি পাহাড়ে আছে ২৮টি পরিবার, পরিবেশ অধিদপ্তর সংলগ্ন সিটি কর্পোরেশন পাহাড়ে ১০ পরিবার, রেলওয়ে, সড়ক-যোগাযোগ বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ওয়াসার মালিকানাধীন মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল সংলগ্ন পাহাড়ে ১৬২ পরিবার, ব্যাক্তি মালিকানাধীন এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি পাহাড়ে ২৬ পরিবার, হারুন খানের পাহাড়ে ৩৩ পরিবার, খাস খতিয়ানভুক্ত পলিটেকনিক কলেজ সংলগ্ন পাহাড়ে ৪৩ পরিবার, মধুশাহ পাহাড়ে ৩৪ পরিবার, ফয়’স লেক আ/এ সংলগ্ন পাহাড়ে ৯ পরিবার, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পাহাড়ে ৩৩ পরিবার, ভিপি সম্পত্তি লালখান বাজার জামেয়াতুল উলুম মাদ্রাসা সংলগ্ন পাহাড়ে ১১ পরিবার, এম আর সিদ্দিকীর পাহাড়ে ৮ পরিবার, মিয়ার পাহাড়ে ৩২ পরিবার, ভেড়া ফকিরের পাহাড়ে ১১ পরিবার, আামিন কলোনি সংলগ্ন ট্যাংকির পাহাড়ে ১৬ পরিবার এবং আকবরশাহ্‌ আ/এ সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ২৮ পরিবার।
আজ থেকে শুরু হওয়া উচ্ছেদে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন, চান্দগাঁও সার্কেলের মোহাম্মদ ফোরকান এলাহী, বাকলিয়া সার্কেলের সাবরিনা আফরিন মুস্তাফা, পতেঙ্গা সার্কেলে তাহমিলুর রহমান, আগ্রাবাদ সার্কেলের শারমিন আখতার ও কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

x