অতল সমুদ্রে কাজলই ভরসা

আর আছে ১৪ ফিটনেসবিহীন ট্রলার, অতিরিক্ত ভাড়া ও ঝুঁকি নিয়ে সন্দ্বীপবাসীর ঈদযাত্রা

লিটন কুমার চৌধুরী, সীতাকুণ্ড

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ
312

সীতাকুণ্ডসন্দ্বীপ রুটে ৭টি ফেরিঘাটে চলাচলরত ১৪টি ট্রলারই ফিটনেসহীন। ফলে এবারের ঈদেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। উল্লেখ্য, প্রতিবছর ঈদযাত্রায় এই রুটে ট্রলার ডুবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এবারও একদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া অন্যদিকে ফিটনেসহীন এসব ট্রলারে সন্দ্বীপ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার আতংকে আছেন যাত্রীরা। তবে ঈদে যাত্রীদের সুবিধার্থে ‘এলসিটি কাজল’ নামে একটি পুরাতন জাহাজ চালু হয়েছে। এতে কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।

জানা যায়, সন্দ্বীপ চ্যানেলে যাত্রী উঠানামা করার জন্য সীতাকুণ্ড এলাকায় ৭টি ফেরিঘাট রয়েছে। ঘাটগুলো হলো, সৈয়দপুরে বাঁকখালী ঘাট, মুরাদপুরে আমির মোহাম্মদ ফেরিঘাট ও ফকিরহাট ফেরিঘাট, বাড়বকুণ্ড ফেরিঘাট, বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট, কুমিরা ফেরিঘাট ও ভাটিয়ারি টোবাকো ঘাট। এসব ঘাট দিয়ে প্রতিনিয়তই যাত্রী উঠানামা করা হয়। ফেরিঘাট কর্তৃপক্ষ এবং ট্রলারের যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সীতাকুণ্ড থেকে ৭টি ঘাটে সন্দ্বীপে প্রতিদিন যাতায়াত করে প্রায় দুই হাজার যাত্রী। ঈদের সময় এ সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রতিটি ঘাটে প্রতিদিন সকালদুপুর দু’টি ট্রলার সন্দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করে। এগুলোর একটিরও ফিটনেস নেই। ট্রলার মালিকরা ফিটনেস কোন কর্তৃপক্ষ থেকে নিতে হবে তাও জানেন না। কিন্তু এসব ট্রলারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন সন্দ্বীপ চ্যানেলে যাত্রী আসাযাওয়া চলছে।

কুমিরা ফেরিঘাট ও ভাটিয়ারি টোবাকো ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি ট্রলারে ৭০ জন যাত্রী উঠানোর নিয়ম থাকলেও সেখানে ১২০১৫০ জন যাত্রী উঠানো হয়। পাশাপাশি মালামালও বহন করা হচ্ছে। অথচ জেলা পরিষদ কর্তৃক ইজারা দেয়ার সময় শর্ত থাকে যে, যাত্রীবাহী ট্রলারে মালামাল আনানেয়া যাবে না এবং প্রত্যেক ট্রলারে দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রাখতে হবে। কিন্তু ট্রলারগুলো এসব শর্ত না মানলেও ঘাট ইজারাদার তাতে বাঁধা না দিয়ে বরং যাত্রীদের ট্রলারে উঠতে উৎসাহ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, সমুদ্রগামী ট্রলারে জীবনরক্ষাকারী বয়া, জ্যাকেট, রেডিও, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, অতিরিক্ত লাইফ জ্যাকেট এবং দিক নির্ণায়ক যন্ত্র থাকার কথা থাকলেও কোনোটি নেই। বর্তমান প্রতিকূল আবহাওয়া পরিস্থিতিতে এসব ট্রলার ডুবে প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন যাত্রীরা।

ভাটিয়ারি টোবাকো ঘাটের ম্যানেজার জসিম উদ্দিন জানান, ট্রলার স্বল্পতার কারণে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে হচ্ছে। এছাড়া অতিরিক্ত যাত্রী ট্রলারে না উঠতে বললেও তারা শোনে না। বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদের কাছ থেকে একটু বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ফিটনেস সম্পর্কে বলেন, সনদ দেয়া হয়েছে। ঈদে যাত্রীদের কিছুটা কষ্ট লাঘব হবে বলে মনে করি।

জানা গেছে, এ রুটে দীর্ঘদিন যাবত বিআইডাব্লিউটিসির জাহাজ বন্ধ থাকার কারণে এপারওপারের যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জাহাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা পণ্যবাহী ছোট ছোট ট্রলারে করে উত্তাল সন্দ্বীপ চ্যানেল পাড়ি দিচ্ছে। তবে ধীর্ঘদিন পর চলতি বছরের ৬ মে থেকে ‘এলসিটি কাজল’ নামে একটি পুরাতন জাহাজ সন্দ্বীপকুমিরা নৌরুটে যাতায়াত শুরু করেছে। গত রমজানে এ রুটে জাহাজ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীদের পারাপার হতে হয়েছে। অবশেষে এলসিটি কাজল চলাচল করায় এবার কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। চট্টগ্রাম থেকে এই জাহাজে করে কুমিরাঘাট হয়ে সন্দ্বীপ যেতে হচ্ছে। তবে একমাত্র জাহাজটির জন্য যাত্রীরা সারাদিন অপেক্ষা না করে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারেই সন্দ্বীপ চ্যানেল পাড়ি দিচ্ছেন।

যাত্রীরা জানান, বাধ্য হয়ে তারা ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট ট্রলার ও লাল বোটে করে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন। যতক্ষণ নদীতে থাকি ততক্ষণ আতঙ্কে থাকি। তবে জাহাজটি সচল হওয়ায় চলতি বর্ষা মৌসুমে অন্তত কিছুটা হলেও দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে মনে করছেন তারা।

বিআইডাব্লিউটিসি চট্টগ্রাম অঞ্চলের ডিজিএম গোপাল মজুমদার জানান, পর্যাপ্ত জাহাজ না থাকায় চট্টগ্রামসন্দ্বীপ নৌরুটে আপাতত এলসিটি কাজল নামে জাহাজটি দেয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগ আছে, অধিক মুনাফার লোভে জেলা পরিষদের ইজারাদাররা স্টিমারের পরিবর্তে অবৈধ মালবাহী ট্রলারে যাত্রী পারাপার করছেন। যার ফলে প্রায় সময় যাত্রীদের সমুদ্র পড়ে যাওয়া ও যাত্রী নিয়ে মাঝপথে নৌযান অচল হয়ে যাওয়ার মত ঘটনাও ঘটছে। এর মধ্যে এই মৌসুমে সমুদ্র উত্তাল থাকে। তাই দুঘর্টনার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

যাত্রীদের অভিযোগ, স্পিডবোটে ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়া হয়। তাই অবৈধ নৌযানে যাত্রী পারাপারের পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। গত ঈদেও আগে নৌপরিবহন মন্ত্রীর বিশেষ হস্তক্ষেপে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রশুতি অনুযায়ী স্টিমার সার্ভিসের ১৩০ টাকা ভাড়া নির্ধারিত হয়। কিন্তু নির্ধারিত ভাড়ার সাথে ইজারাদাররা দুই তীরে নিরাপদে উঠানামার নামে যাত্রী প্রতি ১০ টাকা করে অতিরিক্ত ২০ টাকা নেন। কিন্তু ঘাটের ইজারাদার উঠানামার জন্য পর্যাপ্ত ছোট নৌকা রাখেন না। যার ফলে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়া দিয়ে অন্য নৌকায় করে জাহাজ থেকে তীরে নেমে আসতে হয়। এছাড়া মালের ভাড়ার নামে রীতিমত নৈরাজ্য চলছে। নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন নৌযানে যাত্রীর সাথে থাকা ৩০ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত মালামালের জন্য ভাড়া দিতে হয় না। কিন্তু কুমিরাগুপ্তছরা ঘাটে ১৫ কেজির অতিরিক্ত মালামালের জন্য কেজি প্রতি তিন টাকা হারে মাশুল আদায় করা হয়। তারপরও যাত্রীরা সময় সাশ্রয় এবং দ্রুত পারাপারের জন্য অনেক সময় স্পিড বোটে যাতায়াত করে থাকেন।

সন্দ্বীপবাসীর অভিযোগ, কুমিরাগুপ্তাছরা ঘাট থেকে জেলা পরিষদ বছরে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে থাকে। কিন্তু যাত্রীদের নিরাপদ উঠানামার জন্য কোনো উদ্যোগ তারা নেয় না। দীর্ঘদিন জেলা পরিষদ দুই তীরে কোনো যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করেনি। যার ফলে রোদ কিংবা বৃষ্টিতে যাত্রীদের খোলা আকাশের নিচেই অপেক্ষা করতে হয়। বড় নৌযান থেকে নেমে কখনো কোমর, কখনো বুক সমান পানি ডিঙিয়ে জীবন বাজি রেখে যাত্রীদেরকে কূলে উঠতে হয়।

x