অঞ্চল এবং সম্প্রদায়সমূহে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার

উৎপলকান্তি বড়ুয়া

মঙ্গলবার , ২ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ
146

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার রয়েছে নানান দিক নানান মাত্রিকতা। সৌন্দর্যে, উচ্চারণে, প্রকরণে, ভিন্নতায়, সামঞ্জস্যতায় নানা দিক থেকে এ ভাষার আকর্ষণ ও উৎকর্ষতা আকাশচুম্বী। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার রয়েছে যেমন নিজস্বতা, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন দেশ-অঞ্চলের আশ্রিত ভাষা এবং শব্দের সংমিশ্রণ। এই ভাষা এই অঞ্চলের মানুষের একান্ত আপন, প্রাণের এবং নিজের প্রিয়ভাষা।
এই ভাষা ব্যবহার, চর্চা, মাঝখানে কিছুটা সময় কম পরিলক্ষিত হলেও বর্তমান সময়ে আবার বিশেষভাবে এর প্রতি সরব এবং ব্যবহারের প্রতি বিশেষ নজর পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা খুবই সুখকর এবং আনন্দদায়ক। চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায় রয়েছে, যারা তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব সম্প্রদায়-সংস্কৃতির প্রাধান্যে বা আলোয় এ ভাষায় কথা বলে থাকে বা এ ভাষা ব্যবহার করে থাকে। একই শব্দ ব্যবহারে প্রত্যেক সম্প্রদায়ে উচ্চারিত হয় ভিন্ন উচ্চারণে। যা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিজস্ব সম্প্রদায়গত প্রভাবে বিদ্যমান।
বিশাল সমতলের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে স্থানভেদেও রয়েছে কিছু ভিন্নতা। একই উচ্চারণের একই শব্দেরও রয়েছে ভিন্ন অর্থ। যা অঞ্চলভেদে ব্যবহার হয়। কথায় আছে- এক দেশের বুলি, অন্য দেশের গালি’র মতো। এমন সমার্থক শব্দও নেহায়েত কম নয়। সম্প্রদায়গত ভাষার ভিন্নতা এবং উচ্চারণগত বিষয় নিয়েই এখানে যৎকৃঞ্চিত কথা বা আলোচনার অবতারণা করবো।
‘আইয়ুঁন জে’। প্রমিত বাংলায় যার অর্থ দাড়ায়-আসুন। চট্টগ্রামের দৈনন্দিন সংস্কৃতিতে সাধারণত ‘আইয়ুঁন জে’র অর্থ প্রমিত শব্দ ‘স্বাগতম’ শব্দটাকে বুঝাতেই ব্যবহার করা হয় মূলত। ‘আইয়ুঁন জে’ শব্দটা চট্টগ্রামের মুসলিম সম্প্রদায়ে সাধারণত ব্যবহার হয়ে থাকে। সনাতন সম্প্রদায়ে ‘আইয়ুঁন জে’ শব্দটাকে বলা হয়ে থাকে ‘আসতক’। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে এই শব্দটাকে বলে থাকে ‘আইয়ুঁন’। তেমনি ‘বইয়ুঁন জে’, ‘লইয়ুঁন জে’ ‘খ’অন জে’ ‘ধরন জে’ মুসলিম সম্প্রদায়ে ব্যবহৃত এই শব্দগুলো সনাতন সম্প্রদায়ে ব্যবহৃত হয়-আসতক্‌ ‘বসতক্‌’ ‘ল’তক্‌’ ‘খা’তক্‌’ ‘ধরতক্‌’। তেমনি বৌদ্ধ সম্প্রাদায়ে এ শব্দগুলো-আইয়ুঁন,বইয়ুঁন, লইয়ুঁন, খ’অন, ধরঅন্‌। এখানে ‘বইয়ুঁন জে’ যার প্রমিত বাংলা শব্দ হলো-বসুন, তেমনি লইয়ুঁন হলো- নিয়ে নিন, খ’অন জে-খেয়ে নিন, ধরন জে- হলো ধরুন। এ রকম আরো অনেক অনেক শব্দ আছে যা, প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হয়ে আসছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাভাষিদের মাঝে। উল্লেখ্য যে, মুসলিম সম্প্রদায়ে চট্টগ্রামের এই আঞ্চলিক ভাষাগুলো ব্যবহারে ‘জে’ শব্দটা জুড়ে দিয়ে যাঁর উদ্দেশ্যে বলা হয়ে থাকে তাঁকে সম্মানার্থক অর্থে কথা বলা হয় বলে বুঝানো হয়। আইয়ুঁন জে, বইয়ুঁন জে, লইয়ুঁন জে, খ’অন জে, ধরন জে, ইত্যাদি এই রকম চট্টগ্রামের আঞ্চলিক শব্দসমূহের প্রত্যেকটার পেছনে ‘জে’ শব্দটা জুড়ে বা লাগানো আছে। এই ‘জে’ শব্দটা অতীব সম্মানসূচক অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তেমনি -সনাতন বা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও আসতক্‌, বসতক্‌, ল তক্‌, খা তক্‌, ধরতক্‌, অথবা আইয়ুঁন, বইয়ুঁন, লইয়ুঁন, খাইয়ুঁন, ধইজ্জুন শব্দসমূহকেই এখানেও যাঁর উদ্দেশ্যে বলা হয়ে থাকে তাঁকে সম্মানার্থক অর্থে কথা বলা হয় বলে বুঝানো হয়।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চলে একটা ব্যবহৃত শব্দ হলো- গদ্দাইন্ন্যা। একমাত্র দক্ষিণ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা কথোপকথনে এই শব্দ উচ্চারিত হয় বা অই অঞ্চলের বসবাসরত লোকেরা বলে থাকেন। সাধারণত রাত্রে ভাত খাওয়ার পরের প্রসঙ্গ বা সময়ের সাথে সম্পৃক্ত এই শব্দ ব্যবহার হয়ে থাকে। এখানে কথা প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের ভাষায় বলা হয়ে থাকে- “খঅনর পর গদ্দাইন্ন্যা দি, ভালা গরি পোথাই দে গই।” যার প্রমিত বাংলা শব্দে অর্থ দাঁড়ায়- খাওয়া-দাওয়ার পর, ভালো করে বালিশ মাথায় দিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করো। বিশেষ করে কোনো মেহমান বা অতিথি আসলে, তাদের উদ্দেশ্যেই এমন কথা বেশিরভাগ সময় বলা হয়ে থাকে। এক কথায় মেহমান বা অতিথির প্রতি যত্ন ও সম্মান প্রদর্শন স্বরূপ এ ভাবে বাড়ির বা ঘরের মানুষকে তাদের প্রতি যত্ন সহকারে বিশেষ করে রাতে শোয়া বা ঘুমানোর ব্যবস্থা করতে বলা হয়। দক্ষিণ চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চলে মাথায় দিয়ে ঘুমানোর বালিশকে আঞ্চলিক ভাষায় “গদ্দাইন্না” বলে থাকে।
আবার বৃহৎ চট্টগ্রামের বিশাল অন্য একটা অংশজুড়ে আঞ্চলিক এই ‘গদ্দাইন্ন্যা’ শব্দটির অন্য অর্থ আছে বা বোঝানো হয়। আর এখানে ‘গদ্দাইন্ন্যা’ শব্দটি খুব একটা মন্দ বা খারাপ অর্থে বুঝানো হয়। এখানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় এই ‘গদ্দাইন্ন্যা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় এভাবে এই ধরনের অথের্- “ইতারে গদ্দাইন্ন্যা দি বাইর গরি দে”। প্রমিত বাংলায় যার অর্থ দাড়ায়- তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দাও। এখানে খুব বেশি অপমানার্থক বা নেতিবাচক অর্থেই এই শব্দটা ব্যবহার হয়। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় উচ্চারিত এই একই শব্দ “গদ্দাইন্ন্যা”র অর্থ অঞ্চলভেদে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় ষ্পষ্টভাবে।
‘অইন্দ্যাকাঁলে’। এটি সনাতন সম্প্রদায়ের লোকের মুখেই ব্যবহৃত চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার শব্দ। এই শব্দের প্রমিত বাংলা হলো-সন্ধ্যারকালে বা সন্ধ্যার সময়। আর এই একই শব্দ মুসলিম এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে বলা হয় “হাঁজইন্ন্যা” বা “হাঁউজ্জ্যা”। চট্টগ্রামে “হাঁউজ্জ্যা আঁধা” নামে একটা প্রবাদ বাক্য প্রচলন আছে। এই “হাউজ্জ্যা আঁধা” অর্থ দাড়ায়, সন্ধ্যার সময় থেকে যে লোকে চোখে কম দেখে বা দেখতে পায় না। মানে সন্ধ্যার সময় কম দেখে বা দেখতে পায় না বলেই চট্টগ্রামের ভাষায় “হাউজ্জ্যা আঁধা” বলা হয়।
ফজরত্‌। বেইন্যা। বেয়ানবেলা। তিনটা শব্দেরই একটা অর্থ। আর তা হলো- সকাল বা সকালবেলা। ‘বেইন্যা ঘুমত্তুন উডি খাইল্ল্যা ঠ্যাঙ্গে হাঁডন বউত্‌ ভালা।’ এর প্রমিত বাংলা হলো-সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পায়ে হাঁটা খুব ভালো। ফজরের নামাজের যেই সময়, ঠিক এই সময়টাই মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে “ফজর” নামে অবিহিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে পবিত্র ধর্মীয় নামাজের সময়সংশ্লিষ্ট বলে “ফজর” বলা হয় এই সময়টাকে। আবার অনেকেই এই সময়টাকে “বেইন্যা”ও বলে থাকে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়েও সাধারণত এটাকে “বেইন্যা” বলা হয়ে থাকে। সনাতন সম্প্রদায়ে বেশিরভাগই এটাকে বলে থাকে “বেয়ানবেলা”। তেমনি দুপরের সময় মানে ‘দুপুর’টাকে মুসলিম এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সকলেই প্রায় “দুইজ্জ্যা” আর “দুঁউর” বলে থাকে। যেমন বুড়ো দাদুকে হুঁকো খেতে দেখে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলে থাকে- ‘বুইজ্জ্যা কুইজ্জ্যা তলে বঅই হোক্কা টানের।’ যার অর্থ দাড়ায় এ রকম- ‘বুড়ো খড়ের গাদার নিচে বসে হুক্কা টানছে।’ এ ক্ষেত্রে সনাতন সম্প্রদায়ের অনেকেই দুপুরকে “দুঁউরবেলা” বলে থাকে। উপরোক্ত চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাগুলো স্থান-অঞ্চলভেদে ভিন্ন উচ্চারণে হয়ে থাকে।
‘রাইত’। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার এই শব্দের অর্থ ‘রাত’। সেটা আবার ‘রাতিয়া’। মানে, রাতে বা রাত্রে ও হয়। সকলেই ‘রাতিয়া’ বলে থাকলেও সনাতন সম্প্রদায়ে সেটা বলে থাকে ‘রাতুয়া’ বা ‘রাইতর বেলা’। ‘কাইল রাতিয়া পোয়ার বাপ বাজারত্তুন আইতে বউত্‌ দেরি হইয়ে।’ আর সনাতন সম্প্রদায়ের হলে বলে থাকেন, ‘কালুয়া রাতুয়া পোয়ার বাবা বাজারত্তুন আইতে বউত্‌ দেরি হইয়ে।’ মানে- কাল রাতে ছেলের বাবা বাজার থেকে আসতে বেশ দেরি হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে ‘কালুয়া’ একটা শব্দ যুক্ত হয়েছে। এই ‘কাইল’ শব্দটা সনাতন সম্প্রদায়ে ব্যবহার হয়ে থাকে ‘কালুয়া’ নামে।
কেউ কাউকে ডাকলে, সাড়া দিতে গিয়ে সাধারণত বলে থাকে – জ্বি। আজ্ঞে। এখানে মুসলিম সম্প্রদায়ে নিশ্চিত ‘জ্বি’ এবং সনাতন ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়েও ‘আজ্ঞে’ শব্দটা ব্যবহার হয়। আর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় যদি তা হয়, তা হলে তা হবে এরকম- মুসলিম সম্প্রদায়ে -‘জ্বে’। আর সনাতন ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে হবে- ‘আইজ্ঞা’।
-‘অ পুতুইন্ন্যা, পুতুইন্ন্যারে–’ এভাবে ডাকলে যথাক্রমে জবাব হবে- ‘জ্বে’ আর ‘আইজ্ঞা’। এখানে ‘জ্বি’ থেকে -জ্বে এবং ‘আজ্ঞে’ থেকে- আইজ্ঞা শব্দ এসেছে।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহৃত এমন অনেক অগুনিত শব্দ আছে যা এই অল্প সময় বা পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না। এসব শব্দ বা ভাষা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ এবং সমহিমায় উজ্জ্বল্য দান করে আসছে যুগ যুগ ধরে নিশ্চিতভাবে। এই ভাষা ভাণ্ডারের আলোকিত সময়ের উজ্জ্বল্য ধরে রাখার দায়িত্ব সবসময় নির্ভর করে বর্তমান এবং চলমান প্রজন্মের উপর। বর্তমান এবং চলমান প্রজন্মই পারে একমাত্র এই ভাষাকে যথাযথ ব্যবহার, চর্চার মাধ্যমে সচল রাখতে।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক

x