অজিত রায় আর অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন

মিশে আছে এক সুরের বীণায়

নীল কমল ধ্রুব

বৃহস্পতিবার , ৯ আগস্ট, ২০১৮ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ
6

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা বিদ্রোহী কবিতাটি অজিত রায়ই এদেশে সর্বপ্রথম গানের মাধ্যমে পরিবেশন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর অজিত রায়ের সুরে ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’ গানটিই প্রথম গাওয়া হয়। ১৯৭১এর জুনে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন অজিত রায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর লেখা ও সুরে অনেক গানই দেশবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল জোগায়। ১৯৭২ সালে বেতারে সংগীত পরিচালক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এই বরেণ্যজনের উদ্যোগে ১৯৯০ সালে ঢাকায় শুদ্ধ সংগীত চর্চার সংগঠন ‘অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন’

জন্ম নেয়।

স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত সংগীতজ্ঞ অজিত রায় ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি বাংলা ভাষাকে ঘিরে গান রচনা ও পরিবেশনায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৬৩ সাল থেকে বেতার ও টেলিভিশনে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন শুরু করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা বিদ্রোহী কবিতাটি অজিত রায়ই এদেশে সর্বপ্রথম গানের মাধ্যমে পরিবেশন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর অজিত রায়ের সুরে ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা’ গানটিই প্রথম গাওয়া হয়। ১৯৭১এর জুনে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন অজিত রায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর লেখা ও সুরে অনেক গানই দেশবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল জোগায়। ১৯৭২ সালে বেতারে সংগীত পরিচালক হিসেবে যোগ দেন তিনি। এই বরেণ্যজনের উদ্যোগে ১৯৯০ সালে ঢাকায় শুদ্ধ সংগীত চর্চার সংগঠন ‘অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন’ জন্ম নেয়।

সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী শ্রেয়সী রায়ের সংগীতগুরু ছিলেন বাবা অজিত রায়। তিনি বলতেন, ‘সংগীত এমন একটা শিল্পমাধ্যম, যার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছাকাছি তো বটেই, ঈশ্বরের কাছাকাছিও চলে যাওয়া যায়।’ তাঁর এই বাণীকে জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করে কন্যা শ্রেয়সী ধরেছেন ‘অভ্যুদয়’ এর হাল। বর্তমান ২০১৭২০১৮ সালের কার্যকরী পরিষদে সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তাঁর স্বামী প্রদ্যোৎ মজুমদার। সহসভাপতি পদে আছেন শ্রেয়সী নিজেই। বর্তমানে মূলত চট্টগ্রামের আসকার দীঘির পাড়স্থ রামকৃষ্ণ মিশন লেইনের কার্যালয় থেকেই পরিচালিত হচ্ছে সংগঠনের কার্যক্রম।

শুদ্ধ সংগীতের চর্চা, লালন ও প্রসারের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ‘অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন’ আজ সারাদেশে বহুল জনপ্রিয় একটি সংগঠন। এই পরিচিতি এনে দিয়েছেন বাবার যোগ্য উত্তরসূরি শ্রেয়সী রায়। স্মৃতিচারণ করে তিনি জানালেন, ‘ঠাকুরমা কণিকা রায় এবং বাবাদুজনেই গান গাইতেন। শৈশবে বাবার হাত ধরে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে যেতাম। বাবা গান শেখাতেন, আমি বসে বসে শুনতাম। তৃতীয় শ্রেণিতে ওঠার পর আমার গানের হাতেখড়ি হয় বিপুল ভট্টাচার্যের কাছে। ১৯৯২ সালে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলনে গাইলাম ‘বড় বেদনার মত বাজে’ গানটি। সেই গান শুনে বাবার স্বীকৃতি মিললো। বাবা দিলেন অনুপ্রেরণা। তাঁর সংস্পর্শে এসে পরবর্তীতে তাঁকেই বরণ করি সংগীতগুরু হিসেবে।’

শ্রেয়সী রায় ঢাকায় কলেজে পড়ার সময় ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হন। এরপর ১৯৯৫ সালে বিটিভির তালিকাভুক্ত হন এবং সে বছরই বৃত্তি নিয়ে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। সেখানে তিনি রবীন্দ্রসংগীতে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ২০০৯ সাল থেকে ‘অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন’এর কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি। সাংগঠনিকভাবে যুক্ত আছেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থা, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ সহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে। এছাড়াও জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সংগীত প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শ্রেয়সী রায় মূলত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। এই রবীন্দ্রসংগীতকেই মনেপ্রাণে ধারণ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা গণসংগীত, তিন কবির গান ও তাঁর নিজের রচিত গান গেয়েছেন। তবে তিনি তাঁর শেষ জীবনটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগীতেই সঁপে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথকেই স্মরণ করেছেন। ২০০০ সালে তিনি পেয়েছেন স্বাধীনতা পদক, ২০১১ সালে পেয়েছেন সার্ধশত রবীন্দ্র পুরস্কার। এছাড়া রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ থেকে তিনি গুণীজন পদক, বাংলাদেশ রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সংস্থা থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি পত্র, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শব্দ সৈনিক পদক সহ আরও অনেক সম্মাননায় ভূষিত হন। রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা সংকটের সময় সাহস ও শক্তি জোগায়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথকে এ কারণে প্রাসঙ্গিক মনে হয়। তিনি হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। বাবাই আমাকে বুঝতে শিখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। তবে যে মুহূর্তে আমি রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করে দাঁড়াচ্ছি, রবীন্দ্র দর্শনের আরও গভীরে প্রবেশ করেছি, তখনই বাবা চলে গেলেন অনেক দূরে।’

অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গনে বর্তমানে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী শিল্পী শ্রেয়সী রায়ের তত্ত্বাবধানে রবীন্দ্রসংগীতে তালিম নিচ্ছে। প্রতি বুধবার সন্ধ্যায় এবং শুক্রবার সকালে চলে গানের প্রশিক্ষণ। এর বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংগীত প্রশিক্ষক ও বিচারকের দায়িত্ব পালন, টেলিভিশন চ্যানেলে সংগীত পরিবেশন এবং দেশের বাইরে গিয়ে সংগীতায়োজনে ব্যস্ত সময় পার করতে হয় গুণী এই শিল্পীকে। এক পুত্র ও এক কন্যার জননী শ্রেয়সী কিভাবে এত চাপ সামলান, জানতে চাইলে তার উত্তরে বললেন, ‘আমার স্বামী আপাদমস্তক সংস্কৃতিসেবী। তিনি আমাকে এ ব্যাপারে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। তাঁর জন্যই এসব সম্ভব হচ্ছে। তিনি ‘অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন’এর ধারাবাহিক পথচলায় আমার সারথী।’

শ্রেয়সী রায়ের স্বামী প্রদ্যোৎ মজুমদার জানান, শুদ্ধ সংগীতের চর্চা, লালন ও প্রসারে প্রত্যয়ী ‘অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন’। সত্য ও সুন্দরের আরাধনায় সকল সংকীর্ণতাকে জয় করে মানুষ হিসেবে যাতে জীবনের সার্থকতা ও তাৎপর্যকে নিজেদের কর্মে ও চিন্তায় ফুটিয়ে তোলা যায়সেই প্রত্যয় নিয়েই অভ্যুদয় এর অগ্রযাত্রা। প্রতি বছর নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অভ্যুদয়ের সদস্যদের পরিবার নিয়ে সম্মিলন সহ নানান আয়োজন করে থাকি আমরা। ইতিমধ্যে কবিগুরু স্মরণে ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’, ‘প্রেমের জোয়ারে ভাসাবে দোঁহারে’, ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’, ‘বিস্ময়ে তাই জাগে, জাগে আমার গান’, ‘আমি সুদূরের পিয়াসী’, ‘অতি সনাতন ছন্দে’ প্রভৃতি আয়োজন দর্শকশ্রোতাদের সমর্থনে সফল হয়েছে। সংগঠনের উদ্যোগে প্রবর্তন করা হয়েছে “শিল্পী অজিত রায় স্মৃতি পুরস্কার”।

অভ্যুদয়’ প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করে শিল্পী শ্রেয়সী রায় বলেন, আশির দশকে কিছু নিষ্ঠাবান শিক্ষার্থীকে নিয়ে বাবা অজিত রায় সংগঠনটির জন্ম দিয়েছিলেন। তার শিক্ষার্থীরা আজ দেশবিদেশে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। দরাজ গলায় গাইতেন বলে বঙ্গবন্ধু তাঁকে ডাকতেন ‘রায় বাহাদুর’। আগামী প্রজন্মের জন্য তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকে সংরক্ষণ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। নিজের জীবনদর্শনে সংগীতকে কোথায় স্থান দিয়েছিলেন সেটা তাঁর সংস্পর্শে যারা এসেছেন তারাই বুঝতে পেরেছেন।

শ্রেয়সী রায় বলেন, তখন রেকর্ড, ক্যাসেট এত সহজলভ্য ছিল না। ছোটবেলায় বাবা কোনো নতুন গানে সুর দিলে আমাকে তুলে দিতেন, যেন মনে রাখতে পারি। বাবা বলতেন, ‘যখন গাইবে তখন দাপটের সঙ্গে গাইবে’। বাবার আশীর্বাদে গাইছি, শ্রোতাদের ভালোবাসা পেয়েছি। আসলে সংগীতে শেখার শেষ নেই। এক জীবনে সব শেখা যায় না। আমি এখনো শিখছি। যখন হারমোনিয়াম নিয়ে গাইতে বসি, তখন বাবার কথাই মনে পড়ে বেশি। মনের ভেতর অনুরণিত হয় তাঁর গানগুলো। অজিত রায় আর ‘অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন’ মিশে আছে একসাথে, এক সুরের বীণায়।

x