অঙ্গহানির ফিজিওথেরাপি পুনর্বাসন

মো. মুজিবুল হক শ্যামল

শনিবার , ১৬ মার্চ, ২০১৯ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
80

দেহের যেকোন অঙ্গের (বিশেষ করে হাতে ও পাঁয়ে) হানি ঘটতে পারে নানা কারণে। কোন দুর্ঘটনায় হাত-পা কাটা যেতে পারে। পচন বা গ্যানগ্রিন হলে হাত পা কেটে বাদ দিতে হতে পারে। বিশ্রি ধরনের বিষাক্ত ক্ষত বিশেষ করে ডায়াবেটিসের জন্য অথবা প্রদাহজনিত কারণেও ঐ অঙ্গ বাদ দিতে হয়। এবার ঐসব হাত পা কাটা ব্যক্তিদের তো কর্মক্ষম করে রাখতে হবে তা নাহলে ওরা পরনির্ভর হয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগবে। কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে আত্মহত্যার পথও বেচে নিতে পারে। তাই বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশেষ করে ফিজিওথেরাপির সাহায্যে ঐসব ব্যক্তিদের রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করা দরকার, যাকে বলে অকুপেশনাল থেরাপি (কর্মোপযোগীতা)।
অ্যামপুটেশান বা অঙ্গহানি করার একটি বিশেষ প্রশেস আছে অর্থাৎ অঙ্গচ্ছেদ করার আগে প্লান করে অপারেশান করতে হবে। শরীরের অংশ বা অঙ্গের মাপ বা মেজামেন্ট সঠিকভাবে করতে হবে কারণ স্টাম্প যেন সঠিক দৈর্ঘ্যের হয় তা নাহলে কৃত্রিম অঙ্গ ঠিকমত ফিট করা যাবে না এবং এর ফলত্রুতি স্বরুপ দেখা দেবে নানা উপসর্গ অর্থাৎ কাটা হাত-পায়ের অবশিষ্ট অংশে (স্ট্যাম্প) ক্ষত, ব্যথা এবং কৃত্রিম অঙ্গের ব্যবহার সব কিছুই সতর্কতার সাথে করতে হবে। অ্যামপুটেশানের পরই ঐ কাটা অঙ্গের ক্ষমতা বাড়াতে হবে যাতে হাঁটার বা কাজ করার কোন সমস্যা না হয়। তাছাড়া ভালভাবে ব্যায়াম না দিলে হাঁটু বা কনুইয়ে বিকৃতি বিশেষ করে সামনের দিকে উঠে থাকার (ফ্লেকশান কনটারচার) ফলে লিম্ব ফিটিং বা কৃত্রিম অঙ্গ লাগাতে বেগ পেতে হবে। অঙ্গচ্ছেদের পর অন্তত দু-তিন মাস ভাল করে ব্যায়াম দিতে হবে। এরপর মাংসপেশি ও স্টাম্প ঠিকমত তৈরি হলে কৃত্রিম অঙ্গ লাগাতে হবে। দরকার ঐ আরটিফিশিয়াল লিম্বের যেন কৃত্রিম অঙ্গটি ফিটিং হয়। ঢিলে হলে অথবা টাইট হলে ঐ কাটা অংশে উপসর্গ দেখা দেবে। আজকাল হাল্কা অথচ মজবুত কৃত্রিম অঙ্গ পাওয়া যাচ্ছে। আজকাল প্লাস্টিকের ব্যবহারের জন্য কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেশ হালকা এবং টেকসই হচ্ছে। কিন্তু দরকার সঠিক ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কৃত্রিম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি করা এবং যে অংশে ঐসব লাগান হবে সেইসব কাটা অঙ্গের ব্যায়াম এবং পুনর্বাসনমূলক ব্যবস্থাপনার একান্ত দরকার। লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে হাঁটু ও কনুই ভাঁজ করার উপযুক্ত হিনজ ঐসব লিম্বে থাকে তা নাহলে উঠতে বা বসতে ব্যবহারে কষ্টকর হবে। আজকাল ভাল সব মেটিরিয়াল পাওয়া যাচ্ছে যেগুলি ভাঁজ করতে সুবিধা হবে, সহজে জং ধরে না এবং টেকসইও। তাই অতি দ্রুত সম্ভব আহত প্রত্যেকটি মানুষের শারীরিক মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসন জরুরি। শারীরিক পুনর্বাসন চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি বিশাল ভূমিকা পালন করে। শারীরিকভাবে কেউ আঘাতপ্রাপ্ত হলে বা হাত পা কেটে ফেলা হলে শরীরের প্রত্যেকটি জোড়া, হাড়, ও মাংসপেশীতে প্রভাব ফেলে। রোগী ক্রনিক ব্যথা বেদনায় ভোগেন, কারও অঙ্গহানি হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘ফেনটম পেইম’। এতে রোগীর তীব্র যন্ত্রণা হতে পারে। পা বা হাত নেই তারপরও মনে হবে কাটা পা বা হাত আছে এবং ঐখানে তীব্র ব্যথা হচ্ছে। এসব ব্যথায় পেইন কিলার কোন সমাধান করতে পারে না। উল্টো দীর্ঘদিন পেইন কিলার খেলে হার্ট, কিডনি রোগ, আলসার, স্ট্রোক জাতীয় মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। এক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত আধুনিক, কার্যকর ও নিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি। দুর্র্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের একিউট ও ক্রনিক এই দুই স্ট্রেজে চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। একিউট স্ট্রেজে ইমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট করা হয় যেন রোগী একটি স্টেবল কন্ডিশনে আসে, পাশাপাশি পুনর্বাসন চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হয়, যেন হাড়-জোড়া ও মাংসপেশির কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক থাকে। কোন বিকলাঙ্গতা বা পঙ্গুত্ব রোগীকে কাবু করতে না পারে। আর ত্রনিক স্ট্রেজ অনেক দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি। এই ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। দুর্ঘটনা পরবর্তী শারীরিক আঘাত ও আঘাতের ফলে অঙ্গহানি হলে (যাতে আমরা ডাক্তারী ভাষায় ফিজিক্যাল ডিজএ্যাবলিটি বলে থাকি) দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। এক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার পাশাপাশি অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, সাইকো থেরাপি ও কাউনসেলিং চালিয়ে যেতে হয়। পুনর্বাসন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সমাজকর্মী ও আর্থিক সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় হয়ে থাকে। শারীরিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে অনেক সময় কৃত্রিম হাত বা পা (প্রসথেসিস), অর্থোসেস, ব্রেস ইত্যাদি প্রয়োজন হয়। পুনর্বাসন চিকিৎসা হাল ছেড়ে দিলে চলবে না, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা চালিয়ে গেলে রোগীর আবার আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। প্রয়োজনে কাউনসেলিংয়ের মাধ্যমে ভোকেশনাল ট্রেনিং দিয়ে বিভিন্ন কাজে লাগানো যেতে পারে। ফলে ওই রোগী ফিরে পাবেন তার সমক্ষতা ও কর্মক্ষম জীবন। ভুগতে হবে না পঙ্গুত্বের অভিশাপ। তাই এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাকে সবার সামনে তুলে ধরতে হবে এর মাধ্যমে পঙ্গুত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত থাকা যায়।

x