অগ্নিযুগের অগ্নিকোণ

জয়দীপ দে

শুক্রবার , ৮ মার্চ, ২০১৯ at ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ
17

আভিধানিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব কোণকে অগ্নিকোণ বলা হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে চট্টগ্রাম ভারত উপমহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণেই অবস্থিত। তবে শাব্দিক অর্থ ছাড়িয়ে ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতবর্ষের সবচেয়ে অগ্নিগর্ভ ভূমি চট্টগ্রাম। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে পুরো পূর্ববঙ্গ (ঢাকা বাদে) যখন প্রায় নীরব ছিল, তখন চট্টগ্রামের বীর সিপাহীরা ৩০ ঘন্টার জন্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন রেখেছিল। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামের যুবকরা অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে ৩ দিনের জন্য ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করেছিল চট্টগ্রামকে।তাই মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, Chittagong is to fore.
এই আগ্নেয় ভূখণ্ডের সবচেয়ে উত্তাল সময়ের ( ১৯২০ থেকে ১৯৩৪ সাল) ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘অগ্নিকোণ’। লেখক আজাদ বুলবুল। লেখক পরিচিতিতে যাকে ‘প্রত্ন-সাহিত্যানুসন্ধানের অক্লান্ত পরিব্রাজক’ বলে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। প্রায় সাড়ে ৪ শ পৃষ্ঠার বিশাল এ উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে চট্টগ্রামের মাটিতে যুব বিদ্রোহের বীজ উপ্ত হয়, তার প্রভাবে কিভাবে তৎকালীন বার্মায় (বর্তমানের মিয়ানমারে) জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিকশিত হয় এবং সর্বশেষে সূর্যসেনের মৃত্যুর মাধ্যমে এর চূড়ান্ত পরিণতি লাভ।
উপন্যাসটির শুরু হয় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ফতেয়াবাদ স্কুলের সবুজ প্রান্তর থেকে। সেখানে দেখতে পাই শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করছেন। চট্টগ্রামে তখন যুবকদের মধ্যে দুটো ধারা। প্রথম ধারায় জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে ব্রিটিশ শাসন মুক্ত করার সংগ্রামে লিপ্ত। আরেক ধারা ভাগ্যান্বেষে রেঙ্গুনগামী জাহাজে করে বার্মা পাড়ি দিচ্ছে। তারা বার্মায় গিয়ে চাকরি-বাকরি ব্যবসা-বাণিজ্য করে ছোটখাটো উপনিবেশ গড়ে তুলছে সেখানে। সেখানকার স্থানীয় নারীদের বিয়ে করে নিয়ে আসছে চট্টগ্রামে। এ নিয়ে আবার ফুঁসে উঠছে বার্মার স্থানীয় লোকজন। অং সানের নেতৃত্বে রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গড়ে তুলছে স্বাধিকারের আন্দোলন। এদিকে চট্টগ্রামে স্বাধীনতার আন্দোলনকে ভণ্ডুল করতে ব্রিটিশরা এক নোংরা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়কে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহকে হিন্দু ডাকাতদের কাজ বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। মুসলিম পুলিশ অফিসারকে দেয়া হয়েছে সূর্যসেনকে ধরবার কাজ। বিভিন্ন স্থানে মুসলিমরা বিপ্লবীদের ধরিয়ে দিতে সাহায্য করছে। এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে বিপ্লবীদের হাতে নিহত হয় পুলিশ অফিসার আহসান উল্লাহ। এই মৃত্যুকে ঘিরে চট্টগ্রামে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়। এই দাঙ্গা নিরসনে এগিয়ে আসে চট্টগ্রাম কলেজের মুসলিম ছাত্ররাই। পৌরসভার চেয়ারম্যান নূর আহমদ ঘোষণা দেন, আমি যদি চেয়ারম্যান না হতাম সূর্যসেনের দলে নাম লিখাতাম। এদিকে বার্মা লেজিসলেটিভ এসেম্বলির সদস্য বারি চৌধুরীর নেতৃত্বে বার্মায় বাঙালিদের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধী জনমত গড়ে উঠছে। শামসুল আলম, রশিদ সিদ্দিক, সৈয়দ আহমদ- এদের মতো মহাপ্রাণরা ভারত থেকে পালিয়ে আসা বিপ্লবীদের আশ্রয় দিচ্ছেন। অম্বিকা চক্রবর্তীর মতো বিপ্লবী যাচ্ছেন বার্মায় তাদের সাহায্যের প্রত্যাশায়। সূর্যসেন গ্রেফতার হওয়ার পরবারি চৌধুরীর নেতৃত্বে সৈয়দ আহমদ, শামসুল আলম বার্মা থেকে অর্থ সংগ্রহ করে চট্টগ্রাম নিয়ে আসেন মামলার ব্যয় নির্বাহের জন্য।
উপন্যাসটি একেবারে সাদামাটা গদ্যভাষ্যে লেখা। আঙ্গিকেও তেমন চমক নেই। তবে উপন্যাসের পরতে পরতে যে ডিটেলিং আর তথ্যের প্রাচুর্য তা যে কোন পাঠককে বিমোহিত করে। গ্রন্থসূত্র দেখলেই বোঝা যায় কত অনুধ্যানের পর লেখক এই মহাকাব্যিক রচনাটি সৃষ্টিতে হাত দিয়েছেন। বিশেষ করে লেখকের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার উপর যে দক্ষতা দেখতে পাই তা সত্যি উপভোগ্য। সাথে লেখকের রসবোধেরও প্রশংসা করতে হয়। নিচে একটা ছোট্ট উদাহরণ দেয়ার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।
‘ খাতুনগঞ্জের কুলি সর্দার সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বলে-
চোদানির পোয়াঅলর কারবারগান দেইক্কো না? ইতারা বলে চাইর ঘন্টা বন্দুক চালাই ডাহাইত ধইয্যে। এনডইল্যা বাবু অল ধইত্তে যদি আধাবেলা লড়াই গরন পরে- তইলে চোর ধইত্তে ইতারার জনম যাইবো। ডাহাইত ধরিত পারিবো আঁর চনু।’
এ উপন্যাসের মাধ্যমে লেখক যেন আমাদের মনোভূমিতে ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ ঘটিয়েছেন। যুব বিদ্রাহের উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহ যেমন: রেলওয়ের অস্ত্রাগার লুট, দামপাড়া পুলিশ লাইনে আক্রমণ, জালালাবাদ, কালারপুল, ধলঘাটের যুদ্ধ- ইতিহাসের বিভিন্ন প্রমাণ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এতো নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন, মাঝে মাঝে ভ্রম হয় লেখক বুঝি নিজে দাঁড়িয়ে এসব দেখেছেন। এছাড়া চট্টগ্রামের গণিকাদের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধে যে একটা উজ্জ্বল ভূমিকা ছিল তা এ উপন্যাসে উঠে এসেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চট্টগ্রামের যুব বিদ্রোহের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন সেটাও জানা যায় এ উপন্যাসের মাধ্যমে। তিনি পুলিশের ধৃত এক বিপ্লবীর পরিবারকে সমবেদনা জানিয়ে অর্থ পাঠিয়েছিলেন। তিনি সূর্যসেনকে জাতীয় বীর আখ্যা দিয়ে তার মুক্তি চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন ব্রিটিশ সরকারের কাছে।
তবে উপন্যাসটির আরো উৎকর্ষ সাধনের জায়গা আছে। যেহেতু এটি একটি ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস, এর প্রতিটি পর্ব শুরু হওয়ার আগে সময় কাল ও স্থান উল্লেখ করে দিলে পাঠের সঙ্গে ঘটনাপ্রবাহের সংযোগ সাধনে সুবিধা হয়। এছাড়া কিছু কিছু জায়গায় ভাষার ব্যবহার কেমন অসঙ্গত লেগেছে। যেমন সুরুত জামাল যখন বিনোদের সাথে প্রমিত ভাষায় কথা বলে, তখন বেশ খটকা লাগে। ৩৬ পৃষ্ঠায় দেশবন্ধুর চট্টগ্রাম আগমনের যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাতেও অসঙ্গতি চোখে পড়ে। লেখকের বর্ণনায়: ‘স্টেশন থেকে ঘোড়ার গাড়ি পাহাড়তলী, দেওয়ানহাট, কদমতলী আলকরণ, ফিরিঙ্গিবাজার, লালদিঘির পাড় হয়ে রহমতগঞ্জ আসে’। এই পথরেখা বাস্তবসম্মত নয়। আলকরণ থেকে বটতলি স্টেশন বেশি হলে পাঁচ শ মিটার। কিন্তু লেখক উল্লিখিত পথরেখা অনুসরণ করলে অন্তত ৫ কিলোমিটার ঘুরে আসতে হয়।
সর্বোপরি এমন শ্রমসাধ্য ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস লেখার জন্য লেখককে সাধুবাদ জানাতে হয়।
[বইয়ের নাম: অগ্নিকোণ, লেখক: আজাদ বুলবুল, প্রকাশক: আমরা ক’জন, পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৪৮, মূল্য: ৬০০ টাকা]

- Advertistment -