অগ্নিকোণের প্রীতিলতা

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
25

‘…..কোনো এক গভীর ঘুমের জগতের আহ্বানে তলিয়ে যেতে থাকে সে। বহুদূর থেকে শোনা যায় ঢং ঢং আওয়াজ।…তার অপর্ণাচরণ স্কুল ছুটি হয়েছে।… ছাত্রীরা ছুটে যাচ্ছে গেট পেরিয়ে। ছুটির ঘণ্টার ঢং ঢং আওয়াজ আর বালিকাদের কোলাহল শুনতে শুনতে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় অপর্ণাচরণ বালিকা বিদ্যালয়ের হেড মিস্ট্রেস কুমারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার।’

‘অগ্নিকোণ’ একটি উপন্যাসের নাম। গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে চট্টগ্রামের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজ নিজ ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দ্বিশতাধিক চরিত্র নিয়ে প্রায় সাড়ে চারশ’ পৃষ্ঠার ‘অগ্নিকোণ’ কথাশিল্পী আজাদ বুলবুলের এক অসামান্য কীর্তি। এটি মূলত মাস্টারদা সূর্য সেন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের স্বদেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের অভাবিতপূর্ব ও অবিস্মরণীয় ইতিহাসের গল্প। ‘অগ্নিকোণ’ এক অগ্নিগর্ভ, বিস্ফোরক সময়কালের (১৯২০-১৯৩৪) অসাধারণ ঔপন্যাসিক চিত্রকর্ম। কথাশিল্পী আজাদ বুলবুল এক দুই করে তেষট্টিটি পটচিত্রের ধারাবাহিকতায় যে শিল্পকর্মটি নির্মাণ করেছেন সেখান থেকে প্রীতিলতাকে নিয়ে আমাদের আজকের গল্প। এমন নয় যে এ প্রীতিলতা নতুন রূপে আঁকা নতুন কোনও ছবি। আসলে আমাদের বিপ্লবী অগ্নিকন্যা চিরচেনা প্রীতিলতাকে নতুন কোনও জায়গায় নতুন করে আবিষ্কারের আনন্দটুকু ২৪শে সেপ্টেম্বর তাঁর আত্মাহুতি দিবস উপলক্ষে পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।
অগ্নিকোণের দশম পর্বে খাস্তগীর স্কুলের দেখা পাই আমরা। হাফ স্কুলের দিন নয় সেদিন কিন্তু হঠাৎ স্কুল ছুটি হয়ে গেল। নির্ধারিত সময়ের ছুটি নয় বলে গেটে যানবাহনের ভিড়ভাট্টা নেই। প্রীতিলতা বইখাতা বগলদাবা করে স্কুলের গেট পেরিয়ে আসকার দীঘির পশ্চিম পাড় অভিমুখে রওনা হয়। বাড়িতে পৌঁছে হাতমুখ ধুয়ে সোজা রান্না ঘরে হাজির প্রীতি। পোঁতা বেগুন ও ট্যাংরা মাছের তরকারিতে ধনেপাতার সুঘ্রাণে ক্ষিদেটা জোর পায়। থালায় ভাত বাড়তে গিয়ে হঠাৎ বাবার গলা কানে আসতেই উৎকর্ণ প্রীতিলতা। পিতা জগদ্বন্ধুর তো ফেরার সময় এখন নয়। বাবা চিৎকার করে মাকে ডেকে একটা খবর শোনাচ্ছেন। ক’দিন আগে রেলের ১৭ হাজার টাকা যে ডাকাতেরা লুট করেছিল তারা ধরা পড়েছে। নাগরখানায় পাহাড়ে পুলিশের সঙ্গে দিনভর গোলাগুলি হয়েছে ডাকাতদের। একটা সময়ে ডাকাতেরা জালালাবাদ পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায়। গ্রামবাসীদের তাড়ায় দিশাহারা ডাকাতেরা মুঠি মুঠি খুচরো পয়সা ছড়াতে ছড়াতে পাহাড়ের আড়ালে সরে যেতে সক্ষম হয়।
অন্যদিকে ডাকাত ধরার নাম করে পুলিশ দু’জন নিরীহ মানুষকে গ্রেপ্তার করে গরুর গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে বলে শুনেছেন তিনি। স্ত্রীর জিজ্ঞাসার জবাবে বলছেন, এদের একজন উমাতারা স্কুলের মাস্টার সূর্য সেন। অন্যজন পোর্ট অফিসের কেরানি অম্বিকা চক্রবর্তী। এরা আসলে বায়েজিদ বোস্তামির মাজারে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে মাছকে মুড়ি খাইয়ে ফেরার পথে পুলিশের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে যায়। প্রীতির বুক ধ্বক করে ওঠে। অম্বিকা বাবুর পায়ে গুলি লেগেছে। সূর্য সেন অক্ষত। এদের দু’জনকে হাত-পা বেঁধে গরুর গাড়িতে করে কোতোয়ালিতে নেওয়া হবে শুনে প্রীতি মাকে একটু বাইরে যাবার কথা বলে বাবার অনুমতির অপেক্ষা না করে পূবমুখো ছুটতে থাকে। ‘ক্যাথলিক গির্জা পেরিয়ে, মহসিনিয়া মাদরাসাকে বাম পাশে রেখে রহমতগঞ্জের পথ ধরে আন্দরকিল্লার মোড়ে কল্পনাদের বাড়ি পৌঁছে যায় প্রীতি। কল্পনাদের বাড়ির উঠোনে তখন মানুষের ভিড়। শোনা গেল সামনে পেছনে একদল পুলিশ গরুর গাড়িটি মাঝখানে রেখে চন্দনপুরা মসজিদ দেওয়ান বাজার, রুমঘাটা পেরিয়ে মতিঝরনার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। দেওয়ানজী পুকুরপাড় থেকে বান্ধবী কল্পনার হাত ধরে ভীরু চোখে প্রীতি ডাকাত দেখে এবং লোকের কথা শোনে। সৌম্যদর্শন ধুতি-চাদর পরা মাস্টার মশাই এবং অফিসের পোশাক পরা কেরানি বাবু পুলিশের মার খাচ্ছে আর পুলিশ জনতার রোষের শিকার হয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় গালাগাল শুনতে শুনতে যাচ্ছে। সাব-এরিয়া পেরিয়ে মিউনিসিপ্যাল অফিসকে ডানে রেখে আন্দরকিল্লা মসজিদের কাছাকাছি পৌঁছুতেই দেওয়ানজী পুকুরপাড় থেকে উচ্চস্বরে শ্লোগান শোনা যায়, বন্দে মাতরম, বন্দে মাতরম।
হাসপাতাল টিলা, মিন্টো প্রেস, কোহিনূর লাইব্রেরী, কোঅপারেটিভ অফিস, পৌরসভা চত্বর থেকে ধ্বনিত হতে থাকে জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম ধ্বনি, উপুর্যুপরি। স্লোগানের শব্দে নেতিয়ে পড়া প্রীতি ও কল্পনার নিঃসাড় দেহে সতেজ উদ্দীপনার ফল্গুধারা বয়ে যায়। স্লোগানে ওরাও গলা মেলাতে থাকে।
‘দশ’ অধ্যায়ের পরে ‘উনিশে’ এসে প্রীতি ও কল্পনাকে আবার পাচ্ছি আমরা। হরিখোলার মাঠের উত্তর পাশে জেলা কংগ্রেসের সভাপতি ডা. মহিম দাশগুপ্তের বাড়ির বৈঠকখানায় জরুরি সভায় বসেছেন জেলা সম্পাদক সূর্য সেন এবং তাঁর বিপ্লবী ‘যুগান্তর’ দল। আজকের সভায় দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের অনুসারী ‘অনুশীলন’ দলটিকে রাখা হয়নি। নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের অনুসারী ‘যুগান্তর’ দলে রয়েছে সূর্য সেনের মতো সংগঠক এবং ত্যাগী, পরীক্ষিত কর্মীদল। এ সভায় আমন্ত্রণ পেয়েছে বেথুনের দু’জন ছাত্রী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্ত। এরা দু’জন ‘যুগান্তর’ দলের হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু দায়িত্ব পালন করে আসছে। এরা কোলকাতা থেকে বিশেষ কায়দায় বোমার খোল নিয়ে আসে। কলকাতায় এরা বিপ্লবী দলের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের দায়িত্বও পালন করে। ভারতীয় প্রজাতান্ত্রিক বাহিনীর পক্ষ থেকে স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত এই সভাতে নেওয়া হয় কিন্তু প্রীতিলতা ও কল্পনার উপস্থিতির প্রমাণ হয় না। তবে বিপ্লবে মেয়েদের ভূমিকা রাখা নিয়ে কথা হয়। ‘ঊনিশ’ থেকে ‘বিয়াল্লিশ’ পর্ব পর্যন্ত দলের বিপ্লবী তৎপরতার উল্লেখযোগ্য দুঃসাহসী কর্মকাণ্ডের সাফল্যে প্রীতিলতা বা কল্পনা দত্ত কেউ নেই। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ছয়মাস পরে ‘তেতাল্লিশ’ পর্বে এসে প্রীতিলতাকে আমরা অপর্ণাচরণ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে পাই। কিন্তু কল্পনা দত্তকে চট্টগ্রাম কলেজে আইএসসি’র ছাত্রী হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ এর আগে এদের বন্ধু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে অবশ্য এক ক্লাসের ব্যবধান ছিল দু’জনের মধ্যে। এ পর্বে অম্বিকা চক্রবর্তী এদের দু’জনকে শপথ গ্রহণ সাপেক্ষে দলভুক্ত করার প্রস্তাব দিচ্ছেন সূর্য সেনকে। কুন্দপ্রভার নামও এসেছে এখানে। প্রীতি সম্পর্কে তার ঢাকার ইডেনে পড়াশোনাকালে লীলা নাগের দীপালি সংঘে কাজ করার কথা এবং বেথুনে পাঠকালীন সময়ে আলীপুর জেলখানায় ট্রেগার্ট হত্যা পরিকল্পনায় ফাঁসির দন্ডাদেশ প্রাপ্ত চট্টগ্রামের বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে বেশ কয়েকবার সাক্ষাতের কথাও এসেছে। শেষ পর্যন্ত গোমদন্ডী স্টেশন থেকে মাইল দুয়েক দূরে পূর্বের করলডেঙ্গা পাহাড়ের নিচে এক বৈরাগীর আখড়ায় সূর্য সেনের সঙ্গে প্রীতি ও কল্পনার সাক্ষাতের প্রস্তাবে সূর্য সেন সায় দেন কিন্তু এ সাক্ষাতের খবর বা বর্ণনা উপন্যাসে নেই। ‘ছেচল্লিশ’ পর্বে সূর্য সেনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা প্রীতিলতাকে পাচ্ছি আমরা। সুদীর্ঘ এক ট্রেন যাত্রা শেষে ধলঘাটে নামে প্রীতিলতা। ‘সাতচল্লিশে’ সন্ধ্যার মুখে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে সূর্য সেনের দেখা মেলে। কথা হয়। কিন্তু গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ-মিলিটারি বাড়ি ঘেরাও করে আক্রমণ চালায়। এখানে মিলিটারি টহল দলের প্রধান ক্যামেরুন বিপ্লবী নির্মল সেনের গুলিতে নিহত হয়। দোতলার জানালা পথে সূর্যসেনসহ প্রীতিলতা নিজেদের বাঁচাতে সক্ষম হন তবে অপূর্ব সেন আকস্মিক গুলির শিকার হয়ে মারা যায়। শত্রুর গুলিতে নির্মল সেনের দেহটিও ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
তেষট্টি অধ্যায়ের উপন্যাসটির ‘উনপঞ্চাশ’ সংখ্যাক পর্বটিতে প্রীতিলতা পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাবে হামলার দায়িত্ব পেলেন। উপন্যাসের এটি দীর্ঘতম অধ্যায়। সূর্যসেন কেন এ সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রীতিলতা কিভাবে নিজের যোগ্যতার পরিচয় তুলে ধরলেন, দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে প্রীতির সহকারী কারা থাকছেন, এ অপারেশনের ড্রেস কোড, আর্মস এ্যামুনিশন, রিকভারি গ্রুপ, অপারেশন টাইম, সবকিছুর বিশদ বিবরণ শেষে ‘পঞ্চাশ’ সংখ্যক পর্বে পূর্ণ সামরিক পোশাকে সজ্জিত প্রীতিলতাকে পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছেন আজাদ বুলবুল। সাতজন সহযোদ্ধাসহ প্রীতিবাহিনী তৈরি। ইউরোপিয়ান ক্লাবের বাবুর্চি উত্তর কাট্টলির মনসুর আহমদ যাবতীয় খবরাখবর দিয়েছেন তো বটেই, রান্না ঘর থেকে টর্চ জ্বালিয়ে যথাসময়ে সিগন্যাল দেখাবার দায়িত্বও নিয়েছেন। প্রীতিলতার নির্দেশ মাফিক প্রত্যেকে নির্ধারিত স্থানে তৈরি। রান্নাঘরের জানালা পথে পরপর ৩ বার জ্বলে টর্চের আলো নিভে যায়। গলায় ঝোলানো হুইসেলে লম্বা ফুঁ দিয়ে আক্রমণের মৌখিক নির্দেশ দেন প্রীতিলতা। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আক্রমণ। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। শান্তি চক্রবর্তী ও কালীকিংকরদের বোমার শব্দে কেঁপে ওঠে অন্ধকার রণক্ষেত্র। শান্তি চক্রবর্তীর তরবারিতে কচুকাটা হচ্ছে নরনারী। স্বয়ং প্রীতি দু’হাতে রাইফেল চালাচ্ছেন। আতংকে দিশাহারাদের চিৎকারে ও কান্নায় ক্লাব প্রাঙ্গণ ভারি হয়ে ওঠে। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য মানুষ ছুটছে। পাল্টা আক্রমণের কোনও লক্ষণ না পাওয়ায় অভিযান স্থগিত করার ঘোষণা আসে দলনেতার কাছ থেকে। এখন ফিরে যেতে হবে উত্তর কাট্টলীর গোপন ঠিকানায়। নিয়মানুযায়ী সকলকে এগিয়ে দিয়ে সবশেষে রইলেন প্রীতিলতা। হঠাৎ ঝোঁপঝাড়ের আড়াল থেকে একটা গুলি এসে প্রীতিলতার পিঠে লাগে। প্রচণ্ড ঝাঁকি খেয়ে প্রীতির পতনোন্মুখ শরীরটা মাঝারি এক শিরিষ গাছের গোড়ায় আটকে যায়। তার ঘোরলাগা চোখে একের পর এক ছবি এসে ভিড় করছে। ‘অগ্নিকাণের’ ৩৪০ পৃষ্ঠায় আজাদ বুলবুল তাঁর সুনিপুন তুলিতে প্রীতিলতার জীবননাট্যের শেষ দৃশ্যটি এঁকেছেন।
‘…..কোনো এক গভীর ঘুমের জগতের আহ্বানে তলিয়ে যেতে থাকে সে। বহুদূর থেকে শোনা যায় ঢং ঢং আওয়াজ।…তার অপর্ণাচরণ স্কুল ছুটি হয়েছে।… ছাত্রীরা ছুটে যাচ্ছে গেট পেরিয়ে। ছুটির ঘণ্টার ঢং ঢং আওয়াজ আর বালিকাদের কোলাহল শুনতে শুনতে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় অপর্ণাচরণ বালিকা বিদ্যালয়ের হেড মিস্ট্রেস কুমারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দাদার।’

x