অক্সফোর্ডের ছাত্রসংসদে বাংলার ‘পদ্মা’

নীপা দেব

শনিবার , ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ
76

 

 

নির্বাচনী অঙ্গীকারে আনিশা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। বর্তমান পৃথিবী একটা বড়সড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সকলের মধ্যেই একপ্রকার বিভ্রান্তি। আমাদের সামনে লক্ষ্য কী হওয়া উচিত, কাকে অনুসরণ করা উচিত, কী আমাদের খুশি করবেসবকিছু নিয়েই আমরা আজ বিভ্রান্ত। ফলে, যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন আমাদের বিষণ্নতা, মানসিক অসুস্থতা প্রকট হচ্ছে। বাড়ছে আত্মহত্যা। আনিশা কি ঠিক এই বিষয়টিই চিন্তা করে তার প্রায়োরিটি ঠিক করেছেন কি না জানি না, তবে তার নির্বাচনী ইশতেহারে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারটি বেশ প্রাধান্য পেয়েছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বের অগণিত তরুণতরুণীর স্বপ্ন থাকে, একদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন তাঁরা। কিন্তু, কিছু কিছু ছাত্রছাত্রী তাঁদের স্বপ্নের সীমারেখাকেও ছাড়িয়ে যান। তেমনি এক শিক্ষার্থীর কথা বলবো আজ। ডাক নাম তাঁর পদ্মা। আসল নাম আনিশা ফারুক। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত তরুণী। তিনি যে শুধু অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েছেন তা নয় বরং সেখানে গিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের নাম অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁকে নিয়ে যে খবরটি গর্বে আমাদের বুকের ‘ছাতি’ ফুলায়; আমাদেরকে সাহস দেয় গর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর তা হচ্ছেবাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই মেয়েটি লন্ডনের বিশ্ববিখ্যাত এই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এটা এক ঐতিহাসিক মাইলস্টোন। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তো বটেই আনিশা দক্ষিণ এশিয়ারই প্রথম প্রতিনিধি যিনি অক্সফোর্ড ছাত্র সংসদের শীর্ষ পদের নেতৃত্বে আসলেন!

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েস্টন লাইব্রেরিতে গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভোটের এই ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এর আগে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লেবার ক্লাবের কোচেয়ার ছিলেন। এই ক্লাবের পক্ষ থেকে বিতর্ক, সোশ্যাল ক্যাম্পেইন ইত্যাদি কাজকর্ম পরিচালনার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তিনি। অক্সফোর্ড স্টুডেন্ট পত্রিকার প্রধান সম্পাদক পদেও ছিলেন একসময়। বর্তমানে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত কুইন্স কলেজে ইতিহাস বিষয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন তিনি।

পত্রিকার খবরে প্রকাশবিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ধাপের নির্বাচনের প্রতিটি ধাপেই সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন কুইন্স কলেজের এই ছাত্রী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর ফারুক আহমেদের কন্যা আনিশা ফারুক। তাঁদের গ্রামের বাড়ি ভোলার চর ফ্যাশনে। মেয়ের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত ফারুক আহমেদ ফেসবুকে মেয়ের সাফল্যের খবর জানিয়ে সবার দোয়া চেয়েছেন।

অক্সফোর্ড ইম্প্যাক্ট প্যানেলের প্রার্থী আনিশা নির্বাচনের তৃতীয় রাউন্ডে পান ১ হাজার ৫২৯ ভোট। আর তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী আইভি ম্যানিং পেয়েছেন ১ হাজার ৪১৬ ভোট। বলে রাখা দরকার১৯৬১ সালে যাত্রা শুরু করা অক্সফোর্ড স্টুডেন্ট ইউনিয়ন শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতির বিষয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মন্তব্য করার অধিকার খর্ব করাতে ১৯৯৪ সালে ফুঁসে উঠেছিল অক্সফোর্ড স্টুডেন্ট ইউনিয়ন। সেই আন্দোলনের মুখে তখনকার ব্রিটিশ শিক্ষামন্ত্রী জন প্যাটেনকে সরে যেতে হয়েছিল।

যাই হোক, বলা বাহুল্য যেএই ছাত্র সংসদের পদগুলো খুবই মর্যাদাপূর্ণ। কারণ, এখানে যাঁরা নেতৃত্ব দেন তাঁরা গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করেন। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন, ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারস্যাপার নিয়ে, অধিকার নিয়ে সবার সামনে গিয়ে কথা বলেন। সেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মানে ২২ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল শিক্ষার্থীর প্রতিনিধি হিসেবে নেতৃত্ব দেয়ার দায়িত্ব যাঁর, সেই প্রেসিডেন্ট পদে এবছর ইতিহাস সৃষ্টি করলেন আনিশা।

নির্বাচনী অঙ্গীকারে আনিশা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। বর্তমান পৃথিবী একটা বড়সড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সকলের মধ্যেই একপ্রকার বিভ্রান্তি। আমাদের সামনে লক্ষ্য কী হওয়া উচিত, কাকে অনুসরণ করা উচিত, কী আমাদের খুশি করবেসবকিছু নিয়েই আমরা আজ বিভ্রান্ত। ফলে, যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন আমাদের বিষণ্নতা, মানসিক অসুস্থতা প্রকট হচ্ছে। বাড়ছে আত্মহত্যা। আনিশা কি ঠিক এই বিষয়টিই চিন্তা করে তার প্রায়োরিটি ঠিক করেছেন কি না জানি না, তবে তার নির্বাচনি ইশতেহারে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারটি বেশ প্রাধান্য পেয়েছে। ‘মাইন্ড ইউর হেড’ নামে একটি ক্যাম্পেইনের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন যা মানসিক অসুস্থতা জয় করার জন্য কাজ করবে। এছাড়া একটি ওয়েলফেয়ার ফান্ড গঠন নিয়ে কাজ করার কথা বলেছেন যার মাধ্যমে অক্সফোর্ডের অধীনে কলেজ এবং সেখানকার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বৈষম্য কমিয়ে আনা যায়। এছাড়া প্রশাসনের সঙ্গে লবি ঠিক রেখে ছাত্রদের অধিকার নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার এসেছে তাঁর ইশতেহরে। রুকবুকিং কীভাবে সহজতর করা যায়, কীভাবে স্টুডেন্টসোসাইটির সাথে সম্পৃক্ততা ঠিক রেখে কাজ করা যায়ইত্যাদি বিষয়ও উঠে এসেছে।

এই বিজয় বাংলাদেশের জন্য যেমন অনেক গর্বের তেমনি এটি আমাদের দেশের ছাত্র সংসদগুলোর অকার্যকারিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের দেশেও ছাত্রসংসদগুলো একসময় ছাত্রদের পক্ষে, বাংলাদেশের পক্ষে ভূমিকা রাখত। আজও ছাত্রসংসদ আছে, নেই নির্বাচিত কোনো প্রতিনিধি। আনিশা ফারুক নিজ যোগ্যতায়, নিজ মেধায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন জয় করলেন।

যাই হোক, আনিশা ফারুককে অভিনন্দন! আপনি বাংলাদেশকে জিতিয়েছেন অক্সফোর্ডে, আমাদের দেশেও গত কয়েকদিন ধরে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বেশ কথাবার্তা হচ্ছে। আশা করি, অতি দ্রুত রাকসু, চাকসু, জাকসুসহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রসংসদ নির্বাচন হবে।

আবারও অভিনন্দন জানাই আনিশাকে। জয়তু আনিশা ফারুক।

- Advertistment -