অক্টোবর (শিউলি) গাথা

হাসান মসফিক

মঙ্গলবার , ২০ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:২০ পূর্বাহ্ণ
20

হরশৃঙ্গার। শিউলির ভাল নাম। বা শিউলির অন্য নাম। শিউলির নামের বহর তো দীর্ঘ। কৈশোরে এক বন্ধু শিখিয়েছিল, এই জটিল নাম। আত্মস্থ করতে অনেক সময় লেগেছিল। কিন্তু, এমন নাম- একবার শিখে গেলে ভুলে যাওয়া প্রায় অসম্ভব! শরৎকালের এ-ফুল সারারাত ধরে ফোটে, আর টুপটাপ ঝরতেই থাকে সমানতালে। এই ফুল দুর্গাপূজার আগমনি ফুল হিসেবেও কোথাও কোথাও বিবেচিত হয়।
শিউলি ফুল নিয়ে কেতাবি এসব কথাবার্তা পড়ে নিতে পারেন গুগল ঘেঁটে। কিন্তু, বাঙালি মানসে শিউলি কেন্দ্রিক স্মৃতি নেই এমন ব্যক্তি পাওয়া প্রায় দুস্কর। সুজিত সরকারের এ-সিনেমা মূলত আপনার আজীবনের এসব ভাবনা-স্মৃতিকে তুমুল উস্কে দেবে। যেমন, আমার শৈশব-কৈশোর জুড়ে আছে এক শিউলিগাছের ছায়া। যে গাছ বিয়োগে আমি জীবনে প্রথম ব্যথা পেয়েছিলাম। মানুষ প্রেম-প্রিয়জন বিয়োগে ব্যথাতুর হয়; আমি হয়েছিলাম- একটি গাছ কর্তনে। ঠিক ততখানি জুড়ে ছিল এ-গাছ। কোনো ব্যক্তি নয়, এ-গাছকেই উৎসর্গ করা ছিল আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আহত ফুলের চিকিৎসা’। কিন্তু, নিজের কাছে এ-গাছ কেন এত অর্থবহ! সে-ও প্রায় এক অমূলক প্রশ্ন! অথবা, অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈকি! সে তারাই জানেন, যারা নিজের ভেতর ব্যক্তিগত গাছ লাগান, লালন-পালন করেন, বড় করে তোলেন; আর আজীবন তার ছায়া ভোগ করেন। অথবা, উড়িয়ে দেন, বিলিয়ে দেন- সামগ্রিক সুবাস।
প্রিয়জন হারানোর পর কোন এক সময় এ-ক্রাইসিস তৈরি হয়! হারানো ব্যক্তিকে (অন্য কিছুও হতে পারে) নিয়ে মন খুলে কারো সাথে আলাপ করা যায় না। অনেকে আদিখ্যেতা ভাবেন। বলেন- একটু বেশি বেশি। বা, অহেতুক সান্ত্বনা দেন। কিন্তু, ব্যথাতুর ব্যক্তি তো ঠিক সান্ত্বনা খোঁজেন না। বা, অন্যের চোখে দেখা তেমন বেশি-বেশি কিছুও নয়। তাকে নিয়ে (চলে যাওয়া ব্যক্তি) আবেগ-অনুভূতির কিছুটা মিলিয়ে নেওয়া মাত্র; বা অনেকগুলো কথা নিয়ে দু-দণ্ড পাশাপাশি চুপচাপ বসে থাকা। এজন্যই প্রিয়জন হারানো ব্যক্তি প্রায়শ একা হয়ে যান। এমনকি, নিজের কাছেও।
আসলে বলিউডের যে সিনে-হালচাল সুজিত সরকারের ফিল্ম স্কোর সব সময় কিছুটা ভিন্ন। সেজন্যই বোধকরি উনার ফিল্মে ব্যতিক্রমী লোকজনের আগ্রহ। ফিল্ম রিলিজের পর জেনেছিলাম- উঠতি ধামাকা স্টার বরুন ধাওয়ান উনার ফিল্মে কাজ করতে নিজেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। সে অবশ্য প্রকৃত কাজ-পাগল যে কারোরই উদ্দেশ্য হতে পারে সুজিত সরকারের সাথে কাজ করা। তিনি ব্যবসার চেয়ে কাজকে বড় করে দেখেন। তাই, তাঁর ফিল্ম ঠিক ব্যবসা সফল হয় না। কিন্তু, মনে মনে সিনে-প্রেমীদের বাহবা ঠিকই পেয়ে যান।
অক্টোবর সিনেমার গল্প বিস্তারিত আপনি পর্দায় দেখে নেবেন। আদতে সহজ-সরল গল্প! গল্পের শুরুও প্রায় সাদামাটা। দানিশ ওয়ালিয়া ড্যান (বরুন ধাওয়ান) আর শিউলি আইয়ার (বনিতা সান্ধু) দিল্লির নামী হোটেলের ইন্টার্ন। এক্ষণে হয়ত বুঝতে পারছেন শুরুতে শিউলির অবতারণা কেন করেছিলাম! ড্যান কাজে অমনোযোগী আর বারবার ভুল করতেই থাকে। তার মাশুল স্বরূপ তার জায়গা হয় কখনো হাউজ কিপিং, আর কখনো লন্ড্রিতে। কিন্তু, একটি অনাহুত দুর্ঘটনা বদলে দেয় শিউলি আর ড্যানের জীবন। আর সেখান থেকেই বদলাতে থাকে ফিল্মের মোড়। ড্রামা ধাঁচের এ-ফিল্ম প্রকৃতপক্ষে আমাদের নানা স্মৃতিভাবনা যেমনি উস্কে দেয়, তেমনি কিছু প্রশ্নের সম্মুখীনও করে। যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব পরিচালক দর্শকের দিকেই ছুঁড়ে দিয়েছেন। অথবা, কারো দিকেই দেননি! কেননা, কতক টানাপোড়ন আমাদের নিজেদেরই তৈরি, যা অন্যরা ঠিক রিলেট করতে পারেন না। ফিল্মে ড্যান-শিউলি তেমনি হয়তো একটি সম্পর্ক; কেবলই একটি সম্পর্ক! যার কোন লক্ষ্যই নেই। বোধ করি, সম্পর্কের ক্ষেত্রে লক্ষ্য জরুরী কিছুও হয়ত নয়। ফিল্মে ড্যান -শিউলি সম্পর্ক বা অসম্পর্কের কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন মা, আরও দু’টি পড়ুয়া সন্তান নিয়ে একটি পরিবার … যেন কিছুটা করুণ! আর কয়েকজন বন্ধু। প্রায় আজীবন চলে যায়, যাদের বুঝতে অথবা বোঝাতে!

x